সেলিম আল দীন বাংলার নাট্যভুবনে উজ্বল নাম

বিডিনিউজ ডেস্ক | ঢাকা | ১৯শে আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার, ৪ঠা ভাদ্র, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , শরৎকাল, ১১ই মহর্‌রম, ১৪৪৩ হিজরি

10
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন বাংলার নাট্যভুবনে এক অনন্য উজ্বল নাম। সত্তর-আশির দশকের উত্তাল এই শিল্পমানব বাংলার নাট্যাকাশে অনবদ্য এক পথরেখার সূচনা করেন।

গণমানুষের বলা-না’বলা জীবন কথা, তাদের আনন্দ-বেদনা, বিরহ-যন্ত্রণা সবই শৈল্পীক মহিমায় ধরা দিয়েছে সেলিম আল দীনের নাট্য প্রয়াসে।

প্রজ্ঞা, মেধা, মনন ও দক্ষতায় যে ক’জন নিরলস সাংস্কৃতি ব্যাক্তিত্ব আমাদের সহজিয়া লোকজ বাংলার উর্বর সংস্কৃতিকে বহুমাত্রায় বহুদূর পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গেছেন নাট্যকার সেলিম আল দীন ছিলেন তাদের ভেতর অন্যতম।

বাংলার হাজার বছরের পুরোন লোকজ উপাদানকে ব্যবহার করে জলজ এই ব-দ্বীপের পোঁড় খাওয়া, চির সংগ্রামী, সরল, স্বাধীনচেতা, আত্বনির্ভর, নির্ভিক, সাহসী মানুষদের জীবনকাব্যের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি অত্যন্ত সাবলীলভাবে সেলিম আল দীন তাঁর প্রতিটি নাটকের প্রতিটি দৃশ্যে ফুটিয়ে তুলতে সমর্থ হয়েছেন।

চরিত্রের এই যুক্তিসংগত গ্রহণযগ্যতার কারনেই নাটক তখন শুধুই নিছক মঞ্চের ভাষা হয়ে থাকেনি, তাঁর নাটকের প্রতিটি সংলাপ জীবন্ত হয়ে মিশে গিয়েছিল আমাদের সাধারন জীবনের আনন্দ-বেদনার কাব্যে।

আজ ১৮ আগস্ট অমিত প্রতিভাবান, রবীন্দ্রোত্তর বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ নাট্যকার সেলিম আল দীনের জন্মদিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে ফেনী জেলার সোনাগাজী থানার সেনেরখিল গ্রামে তিনি জন্ম লাভ করেন।

মফিজউদ্দিন আহমেদ ও ফিরোজা খাতুনের তৃতীয় সন্তান ড. সেলিম আল দীন। তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে ফেনী, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রংপুরের বিভিন্ন স্থানে। সেলিম আল দীনের বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা।

সেই সূত্রে ঘুরেছেন বহু জায়গা। ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি ছিল তাঁর প্রবল ঝোঁক। তাই নতুন বই দেখলেই পড়ে ফেলতেন এক নিমিষেই।

বাবার চাকরির সূত্রে এসব জায়গার বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনা করেছেন তিনি। সেলিম আল দীন ১৯৬৪ সালে ফেনীর সেনেরখিলের মঙ্গলকান্দি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ১৯৬৬ সালে ফেনী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।

দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে গিয়ে ভর্তি হন টাঙ্গাইলের করটিয়ায় সাদত কলেজে। সেখান থেকে স্নাতক পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

লেখক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৮ সালে, কবি আহসান হাবিব সম্পাদিত দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার মাধ্যমে। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের নিয়ে লেখা তাঁর বাংলা প্রবন্ধ ‘নিগ্রো সাহিত্য’ ছাপা হয় ওই পত্রিকায়। ১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে নাটকের ওপর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন সেলিম আল দীন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন সেলিম আল দীন, যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটারে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষে যোগ দেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘বিটপী’তে কপি রাইটার হিসেবে।

১৯৭৪ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ওই বছরই বেগমজাদী মেহেরুন্নেসার সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। তাদের একমাত্র সন্তান মইনুল হাসানের অকালমৃত্যু হয়।

মধ্যযুগের বাংলা নাট্যরীতি নিয়ে গবেষণা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। বাংলাদেশে একমাত্র বাংলা নাট্যকোষেরও তিনি প্রণেতা।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকেন্দ্রিক এথনিক থিয়েটারেরও তিনি উদ্ভাবনকারী। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সেলিম আল দীন ১৯৮১-৮২ সালে নাট্য নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফকে সাথী করে গড়ে তোলেন গ্রাম থিয়েটার।

তাঁর প্রথম রেডিও নাটক ‘বিপরীত তমসায়’ ১৯৬৯ সালে এবং টেলিভিশন নাটক আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় লিব্রিয়াম (পরিবর্তিত নাম ‘ঘুম নেই’) প্রচারিত হয় ১৯৭০ সালে। আমিরুল হক চৌধুরী নির্দেশিত এবং বহুবচন প্রযোজিত প্রথম মঞ্চনাটক ‘সর্প বিষয়ক গল্প’ মঞ্চায়ন করা হয় ১৯৭২ সালে।

তিনি শুধু নাটক রচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বাংলা ভাষার একমাত্র নাট্যবিষয়ক কোষগ্রন্থ ‘বাংলা নাট্যকোষ’ সংগ্রহ সংকলন, প্রণয়ন ও সম্পাদনা করেছেন। তাঁর রচিত ‘হরগজ’ নাটকটি সুয়েডীয় ভাষায় অনূদিত হয় এবং এ নাটকটি ভারতের রঙ্গকর্মী নাট্যদল হিন্দি ভাষায় মঞ্চায়ন করেছে।

নাটককে সেলিম আল দীন ইংরেজ নির্দেশিত পাঁচ অঙ্ক আর বিসর্গ চিহ্নিত সংলাপের নির্ধারিত বৃত্তে বেঁধে রাখতে চাননি। প্রাচ্য ভূখণ্ডের ধারাবাহিকতা ঘেঁটে তিনি আবিষ্কার করেছেন শিল্পের আঙ্গিক লুপ্তির কৌশল। তাই তাঁর নাটক একাধারে গান, কাব্য, উপন্যাসের বিস্তৃতি ও নাট্যময়।

বাংলাদেশের বিচিত্র শ্রমজীবী, পেশাজীবী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজ জীবন ও তাদের আবহমান কালের সংস্কৃতিকে নাটকে মহাকাব্যিক ব্যাপ্তিদান করেছেন। জীবদ্দশায় তিনি একজন নাট্যকার হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করলেও নাট্যকার পরিচয়ের বাইরে তিনি ছিলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক, সংগঠক, নাট্যনির্দেশক এবং শিল্পতাত্ত্বিক।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠা সেলিম আল দীনের হাত ধরেই। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। ১৯৮১-৮২ সালে আমৃত্যু শিল্পসঙ্গী নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন গ্রাম থিয়েটার।

মূলত, ঢাকা থিয়েটারের সাংগঠনিক কাঠামো থেকে তিনি তাঁর সুবিস্তৃত নিরীক্ষামূলক নাট্য রচনা ও তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

সেলিম আল দীনের প্রথমদিককার নাটকের মধ্যে ‘সর্পবিষয়ক গল্প’, ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘মূল সমস্যা’ নাটকের নাম ঘুরে ফিরে আসে। সেই সঙ্গে ‘প্রাচ্য’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘বাসন’, ‘আততায়ী’, ‘কেরামত মঙ্গল’, ‘হাত হদাই’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’ ও ‘চাকা’ তাকে ব্যতিক্রমধর্মী নাট্যকার হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

পাশাপাশি রয়েছে ‘শকুন্তলা’, ‘হরগজ’, ‘প্রাচ্য’, ‘ধাবমান’, ‘স্বর্ণবোয়াল’, ‘পুত্র’, ‘বনপাংশুল’। তাঁর রচিত গীতিনৃত্যনাট্য ‘স্বপ্ন রমণীগণ’ ও ‘ঊষা উৎসব’। জীবনের শেষ ভাগে ‘নিমজ্জন’ নামে মহাকাব্যিক এক উপাখ্যান বেরিয়ে আসে সেলিম আল দীনের কলম থেকে।

২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি দেশজ নাট্য ও সংস্কৃতির এই অনুসন্ধানী পথিকৃৎ অগণিত ভক্ত-অনুসারীদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

সেলিম আল দীনের নাটক ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। নাট্যচর্চায় অসামান্য অবদানের জন্য সেলিম আল দীন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার-সম্মাননা লাভ করেন।

Previous articleবঙ্গবন্ধু মহানস্বাধীনতার স্থপতি, স্বদেশ বিনির্মাণের রাষ্ট্রনায়ক: পলক
Next articleআমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি: অনেক দূর যেতে হবে: পরিকল্পনা নিয়েছি: প্রধানমন্ত্রী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here