গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হারিকেন এখন জাদুঘরে

3

জামালপুর প্রতিনিধি: হারিকেন হাতে নিয়ে ডাকপিয়ন ছুটে চলতো গ্রামের পর গ্রামে। বৃদ্ধরা রাতে বের হলেই হাতে থাকত হারিকেন। গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি অন্যতম প্রতীক ছিল কেরোসিন দিয়ে জ্বালানো হারিকেন বা কুপিবাতি।

বিদ্যুৎবিহীন গ্রামীণ জনপদের আলোর চাহিদা মিটানো বা অন্ধকার দূর করার একমাত্র অবলম্বন ছিল হারিকেন বা কুপিবাতি। যাকে তখনকার সময়ে রাত্রিকালীন বন্ধু হিসাবে অখ্যায়িত করা হয়েছিল।

কিন্তু কালের বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই হারিকেন বা কুপিবাতি আজ বিলুপ্তির পথে। গ্রামাঞ্চলে এখনও দু-এক বাড়িতে হারিকেন পাওয়া গেলেও ব্যবহার না করায় সেগুলোতে ময়লা ও মরিচা পড়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেছে। 

হারিকেন বা কুপিবাতি জ্বালিয়ে বাড়ির ঊঠানে কিংবা ঘরের বারান্দায় পাটি বিছিয়ে ভাই-বোন একসাথে পড়াশোনা করতো।

হারিকেনের জ্বালানি কেরোসিন আনার জন্য কাচের বোতল ছিল। যা রশি দিয়ে বেঁধে রান্নাঘরের কোন স্থানে ঝুলিয়ে রাখা হতো। সন্ধ্যার আগেই হারিকেনের কাঁচ বা চিমনি মুছে তেল ভরে জ্বালানো হতো।

হারিকেন হলো টিনের তৈরি দুটো খুঁটি ও কাচের চিমনি বিশিষ্ট প্রদীপ। কাচের চিমনির নিচের অংশে টিনের তৈরি তেলের ট্যাংক থাকতো।

যেখানে কেরোসিন তেল ঢালা হতো। মাঝখানে থাকতো ফিতে, গ্রামবাংলায় বলা হতো পলতে বা সলতে। যার এক চতুর্থাংশ ট্যাংকের তেলের মধ্যে আর বাকি অংশ থাকতো উপরে কাচের চিমনির মধ্যে।

উপরের অংশে আগুন জ্বালালেই আলো ছড়াতো। তেল রাখার অংশে আলো কমানো বাড়ানো বা নিবানোর জন্য একটি চাকতি থাকতো।
অন্ধকার রাতে হারিকেনের মিটি মিটি আলো জ্বালিয়ে পথচলার স্মৃতি কার না মনে পড়ে।

এবাড়ি থেকে ওবাড়ি যেতে, হাট বাজারে বা পথ চলায় কিংবা স্বামী হাট-বাজার থেকে ফিরতে রাত হলে স্ত্রী হারিকেন হাতে পথ পানে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। হাট বাজারে প্রতিটি দোকানে সন্ধ্যার আগেই জ্বালানো হতো হারিকেন বা কুপিবাতি।

হারিকেনের আলো গৃহস্থালির পাশাপাশি ব্যবহার হতো রেলগাড়ি ও বিভিন্ন যানবাহনে। রাতে চলাচলের জন্য নৌকার মাঝিরাও হারিকেন ব্যবহার করতো। সন্ধ্যার পর ভ্যান, রিকশায় দেখা যেতো হারিকেন বাতি।

তখনকার সময় এ সব জ্বালিয়ে গ্রামাঞ্চলে রাতে বিয়ে-সাদি, যাত্রাগান, মঞ্চ নাটক, ওয়াজ মহাফিল কিংবা বাড়িতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা হতো।

জামালপুরের প্রতিটি হাট বাজারেই পাওয়া যেত হারিকেন বা কুপিবাতি মেরামতের জন্য মিস্ত্রি। যারা জীবিকা নির্বাহই করতেন হারিকেন মেরামত করে। বিভিন্ন হাটে বা বাড়ি বাড়ি গিয়েও মেরামত করে দিতেন মিস্ত্রিরা।

গ্রামগঞ্জে হারিকেন বিলুপ্ত হওয়ায় জীবিকার তাগিদে এখন এরা বিভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন। 

একসময় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ‘ডাক হরকরা’ গল্পের নায়কের মতো ডাক পিয়নরা চিঠির বোঝা পিঠে করে হাতে হারিকেন নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম ছুটে চলতো।

কিন্তু সময়ের বিবর্তনে বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম বাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী হারিকেন এখন বিলুপ্তির পথে। গ্রামাঞ্চলে এখন হারিকেন যেমন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর তেমনি বিদ্যুৎ নেই এমন গ্রামও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না।

যেখানে বিদ্যুৎ নেই, সেখানে হারিকেনের জায়গা দখল করে নিয়েছে সৌর বিদ্যুতের আলো বা চার্জার লাইট।

সরিষাবাড়ি উপজেলার চর বড়বাড়িয়া এলাকার ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ এছহাক আলী বলেন, ছোট বেলায় আমরা হারিকেন বা কুপিবাতির মৃদু আলোয় লেখাপড়া করেছি।

বাতাসের ঝাপটায় কখনও কখনও আলো নিভে গেছে। আবার দিয়াশলাই বা চুলার আগুনে পাটকাঠি দিয়ে আলো জ্বালিয়েছি।

মেলান্দহ উপজেলার মধ্যের চর গ্রামের সৈয়দ আলী নামের আরেক বৃদ্ধা বলেন, হারিকেনের আলো মুদৃ হলেও সেই সময় পড়ালেখা বা বিভিন্ন কাজকর্ম করতে চোখের তেমন সমস্যা হতো না।

এমনকি বয়োজ্যেষ্ঠরাও স্বাভাবিক ভাবেই চলতো। কিন্তু আজ বিদ্যুতের আলোর ঝলকানিতে শিশু ও প্রবীণদের চোখে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হারিকেন এখন শুধুই স্মৃতি। নতুন প্রজন্ম হয়তো হারিকেন সম্পর্কে জানবে না, বইয়ে পড়তে হবে ইতিহাস। কালে বিবর্তনে হয়তো একসময় হারিকেন এর দেখা মিলবে জাদুঘরে।

Previous articleনিরাপদ অভিবাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন শীর্ষক সেমিনার
Next articleড: মুহম্মদ জাফর ইকবালের ৭০তম জন্মদিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here