আমলাদের ভুলে সমালোচিত হচ্ছে সরকার

8

৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা করলেন যে, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সারাদেশে লকডাউন দেওয়া হবে।

তিনি এটিও জানিয়ে দিলেন যে, এই লকডাউন হবে সাত দিনের জন্য। ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কাজেই তার এই ঘোষণা অবশ্যই রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে।

একটি রাজনৈতিক সরকারের দলের সাধারণ সম্পাদক এরকম নীতিনির্ধারনী ঘোষণা দিতেই পারেন। ওবায়দুল কাদেরের এই ঘোষণার পরপরই জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, ৫ এপ্রিল থেকে যে লকডাউন ঘোষণা করা হবে সেই লকডাউনের একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা কি করা যাবে, না যাবে, কি ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে, কি খোলা থাকবে, কি বন্ধ থাকবে, সে সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে ঐদিন বিকেলে অথবা রোববার। রোববারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

এর আগে মন্ত্রীপরিষদ সচিব লকডাউনে কি করণীয়, কি করণীয় নয় ইত্যাদি নিয়ে সিনিয়র সচিবদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন এবং বৈঠক করে  নির্দেশমালার একটি খসড়া প্রণয়ন করেন।

সে খসড়াটি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে রোববার সেটি প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়, এবং ৫ এপ্রিল থেকে দেশে লকডাউন চলছে।  এই লকডাউনের পুরো কর্মপরিকল্পনাটি করা হয়েছে আমলাতান্ত্রিকভাবে এবং এটি আমলারা করেছেন।

আর এই লকডাউনে যে জগাখিচুড়ি অবস্থা সেটির জন্য সরকারকে দায়ী করছেন সাধারণ মানুষ। আবার লকডাউন এর প্রথমদিন বিকেলেই মন্ত্রিপরিষদ সচিব ঘোষণা করলেন এটি লকডাউন না কঠোর বিধি-নিষেধ। তাহলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব কি, সরকারের একজন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাবান এই প্রশ্ন উঠেছে?

ক্ষমতাসীল দলের সাধারণ সম্পাদক যখন লকডাউন বলেন তখন মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন এটি লকডাউন নয়। তাহলে কার বক্তব্য সত্যিই এবং কে ক্ষমতাবান এই প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া লকডাউনের ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যে বিধি-নিষেধ গুলোর কথা বলেছে তার সবগুলো স্ববিরোধী, আত্মঘাতী এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যপূর্ণও বটে।

যেমন বলা হচ্ছে, যে সীমিত আকারে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে। অর্থাৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত লোকবল দিয়ে সীমিত আকারে চলবে। নিজস্ব পরিবহন ব্যবহার করতে হবে।

বাংলাদেশের ৯০ ভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা নেই। আর এখন সামনে যখন রোজা এবং ঈদ, সে সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই এই সুযোগটাকে কাজে লাগাচ্ছে।

ফলে এই লকডাউন কার্যত অচল হয়ে গেছে। মানুষ যেভাবে পারছে তার প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথম দিন বন্ধ থাকলেও দ্বিতীয় দিন মোটামুটি সচল হয়ে গেছে। রাস্তায় এখন ভিড়ভাট্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থাৎ কার্যত লকডাউন বা বিধি-নিষেধ হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের কিছু উদ্ভট ব্যাপার হলো যেমন;

১. বইমেলা খোলা রাখা হয়েছে: একদিকে বলা হচ্ছে লকডাউন অন্যদিকে বইমেলা খোলা হচ্ছে। এটি একদম সম্পূর্ণ স্ববিরোধী।

২. ব্যাংকের সময়সীমা সীমিত করা হয়েছে: বলা হচ্ছে যে, ব্যাংকগুলো দশটা থেকে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত খোলা থাকবে। অর্থাৎ সমস্ত মানুষ ওই সময় ভিড় করবে। অথচ ব্যাংকের সময়সূচী যদি ঠিক করে দেওয়া যেত এবং মানুষের যাতায়াত যদি সীমিত করা যেত ব্যাংকে তাহলে পরে হয়ত সামাজিক দূরত্ব বিষয়টি কাজে লাগতো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন ব্যাংক গুলোতে উপচে পড়া ভিড়।

৩. গণপরিবহন বন্ধ অথচ প্রাইভেট কার চালু: গণপরিবহন বন্ধ করা হয়েছে অথচ প্রাইভেট কার চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সিএনজি চালু রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছে ভোগান্তিতে। কাজেই এই লকডাউন নিম্ন আয়ের মানুষকে বিপদে ফেলেছে এবং ক্ষুব্ধ করছে, যার সমালোচনাটা সরকারের গায়ে গিয়ে পড়ছে। এই সমালোচনা সরকার বুঝতে পেরেই আগামীকাল থেকে গণপরিবহন সীমিত আকারে চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

৪. সবকিছু খোলা শপিংমল বন্ধ: শপিংমল বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে অথচ এই সময় অন্য সবকিছু যখন খোলা তখন শপিংমলগুলো সামাজিক দূরত্ব মেনে এবং বিধি-নিষেধ মেনে কেন খোলা রাখা হবে না এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যবসায়ীরা।

৫. বাজারহাটের সময় সীমাবদ্ধ করণ এবং উন্মুক্ত স্থানে বাজারহাট করা: বাজারহাটের সময় সংক্ষিপ্ত করার ফলে ওখানেও উপচে পড়া ভিড় পড়ছে এবং মানুষ সেখানে গিয়ে নানা রকম ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন। লকডাউন কার্যত একটা অদ্ভুত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সব মানুষ বেরুচ্ছে, সব মানুষ কাজ করছে, কিন্তু নানা রকম জটিলতা এবং বাধারোপ করা হয়েছে। আর এটি করে করা হয়েছে আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে।

বিশেষজ্ঞরা বলছে, যদি সত্যি সত্যি সরকার লকডাউন দিত তাহলে পুরোপুরি লকডাউন দিয়ে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতো। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক ভুলে এখন যে লকডাউন বা বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে সেটি কার্যত জনগণের জন্য এক ধরনের সমস্যা তৈরি করছে এবং জনগণ এই লকডাউন এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এখন প্রকাশ্যে সমালোচনা করছে সরকারের। আমলাতন্ত্রের ভুলেই সমালোচিত হচ্ছে সরকার।

বাংলা ইনসাইডার

Previous articleউভয় সঙ্কটে বাবুনগরী
Next articleলক্ষ্মীপুর গ্রাম পুলিশদের মাঝে বাইসাইকেল বিতরন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here