হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যে ফোকলোর

67
Humayun Ahamed
Humayun Ahamed

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যে ফোকলোর ।। জাফর জয়নাল

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে জানতেন- তার বড় প্রমাণ তার লেখা গান। লোকায়ত মানুষের কথা এবং সুর তাঁর লেখা গানে প্রাণময় হয়। কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি যে চরিত্র নির্মাণ করেছেন, তাদের মুখে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের বিশ্বাস এবং সংস্কারকে বাণী আকারে তুলে দিয়েছেন। ফিকশনের যে চমক দেওয়ার বিষয়টি জরুরি, হুমায়ূন আহমেদের সে বিষয়ে ছিল দারুণ দখল। গল্পে তিনি প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার করেছেন, একদম অনুচ্ছেদের শুরুতে, ফলে তার প্রভাব পুরো অনুচ্ছেদের ভিতর ছড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সংস্কৃতিতে যে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের যৌথ মিথ এবং কিংবদন্তির প্রভাব রয়েছে, সে বিষয়ে সর্তক দৃষ্টি রেখে হুমায়ূন তার সাহিত্যে সৃষ্টি করেছেন । সাধারণ মানুষের ভিতর জিন-ভূতের যে গল্প থাকে, তাকে তিনি গুরুত্বে দিয়ে সামনে নিয়ে আনেন। সাধারণ মানুষ ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করে, হুমায়ূন সাহিত্যে ভূত-প্রেতের ছড়াছড়ি আছে, গল্পের প্রয়োজনেই।

লেখার ভিতর মিথ তৈরির বিষয়ে হুমায়ূন আহমেদ আলাদা কৌশল ব্যবহারে বিশেষ পারদর্শী। লোকজ্ঞানের অনেক বিষয় হুমায়ূন আহমেদ গল্পের ভিতর ছোট ছোট আকারে ছড়িয়ে দেন। কখনো দেন চরিত্রের মুখে- শিল্লুক তথা ধাঁধা, ফলে গল্প হয়ে উঠে লোকজীবনের অন্য এক চর্চার জায়গা। ধর্মীয় জীবনের ছোট ছোট কিন্তু চমকপ্রদ বিষয় তিনি নিয়ে আসেন, ঘটনা প্রবাহের সমান্তরালে। এমন সব লোকজীবনের ঘটনা তাঁর লেখায় দৃশ্যমান হয় যে, তাতে একজন সাধারণ পাঠক বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনে যাবে। মন্ত্র থেকে বৈশীকরণ বিদ্যা, লোক-সাধারণের রান্না থেকে রান্না বিষয়ক লোকাচার তার লেখায় চক্ষুষ্মান হয়।

হুমায়ূন আহমেদ জীবনকে সহজ করে দেখতে ভালোবাসতেন, তাঁর সাহিত্যও তেমনি সহজ-সরলের ব্যাকরণ, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও তেমন সাধারণ জীবন পছন্দ করে। সাধারণের মানুষ জটিলতা পছন্দ করে না, জটিল মানুষকে তারা ‘ছিটগ্রস্ত’ বলে চালিয়ে দিতে চায়। ভ্রাম্যমাণ জাদুশিল্পের প্রতি হুমায়ূনের ব্যক্তিগত আগ্রহ ছিল, সাহিত্যে তার ছায়া পড়েছে, ফলে আমরা বাংলাদেশের ভ্রাম্যমাণ জাদুশিল্পচর্চাকারী গোষ্ঠীদের জীবন এবং জিজ্ঞাসার নানা উত্তর পায়। বিজ্ঞান এবং লৌকিক বিষয়গুলিকে তিনি নিপুনভাবে উপস্থাপন করেছেন, ফলে বিজ্ঞান ও লৌকিক জীবনের ভিতর যে একপ্রকার সেতুবন্ধন হুমায়ূন সাহিত্যে তৈরি হয়েছে তা সত্যি গবেষণার বিষয়, ভবিষ্যতের গবেষকের হাতে দেয়া রইলো দায়িত্বভার।

ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, কিংবা আত্মজীবনীতে তিনি এসব লৌকিক আচার-বিশ্বাসের কথা বলেছেন। কোথাও বিষয়গুলি গল্প কে ছাপিয়ে যায়নি, কিন্তু গল্পগুলিকে আরও বেশিমাত্রায় বিশ্বাসযোগ্য করার বিষয়ে এই লৌকিক কাহিনিযুক্ত করার ভালো ফল ঘটেছে। তাঁর সাহিত্যে কাহিনিগুলো আর দশজন কথাসাহিত্যিকের সাহিত্য থেকে হুমায়ূন সাহিত্যকে দিয়েছে ভিন্নতার ছোঁয়া। লৌকিক কিংবদনিন্ত বিষয়ে বাংলা সাহিত্যে আর একজন খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক হলেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। ইলিয়াস তাঁর সাহিত্যে সাধারণের কথা সাধারণের ভাষা দিয়ে প্রকাশ করেছেন, বগুড়া কিংবা পুরান ঢাকার মানুষের ভাষা তার ভালো উদাহরণ। হুমায়ূন আহমেদ ব্যবহার করেছেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের ভাষা, যে ভাষা ধারণ করে আছে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের মানুষদের বুঝতে হলে তাই হুমায়ূন আহমেদ পাঠ একটি অন্যতম জরুরি বিষয়।

লেখক-
গবেষক ও প্রাবন্ধিক
[email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here