মুমুর জন্য ভালোবাসা এবং একটি নিখোঁজ সংবাদ

81
Jafour Joynal

মুমুর জন্য ভালোবাসা এবং একটি নিখোঁজ সংবাদ : জাফর জয়নাল

কদিন হল মুমু’র ভাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না । তাতে বাড়ির কারো তেমন কোনো ভাবনা চিন্তার ভাবান্তর দেখা যাচ্ছে না । যে যার মত নিজ নিজ কাজে যথাবিহীত ব্যস্ত। মাঝে মাঝে শুধু বাবা বলছেন, খালেদ কই ! খালেদ কই বলেই তিনি মুমুকে ডাক দেন । মুমু বাড়ির ছোট মেয়ে। কলেজে গণিতে অনার্স পড়ছে, এবার বাইশে পড়েছে সে। ডিসেম্বরে অনার্স ফাইনাল দেবে । গণিতের ক্লাসের জন্য মাঝে মাঝে তাকে কলেজে যেতে হয় । সেই সময় তার প্রেমিক অরিককের সঙ্গে দেখা হয়। রাত জেগে প্রেমিকের সঙ্গে মেসেঞ্জারে আলাপ হয় । ইদানিং সেই আলোচনা ভালো হচ্ছে না। কারণ অরিক সামনের এপ্রিলে বিসিএস পরীক্ষা দেবে। ছেলেটা একটা ভালো চাকুরি পেলে বিয়ের সম্ভাবনাটা কাজে লাগানো যাবে । মুমু অবশ্য অরিককে এবিষয়ে তেমন কিছু বলে না । কিন্তু অরিক তার তাড়না অনুভব করে । মুমু সারাদিন এমন নানাবিধ কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তার নাগাল পাওয়া ভার ।

খালেদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনা নতুন না। মাঝে মাঝেই খালেদ নিখোঁজ হয়। নিখোঁজ থাকে সে কিছুদিন তারপর অনেক খোঁজা খুঁজির পর পাওয়া যায়। নিখোঁজ হওয়া তার অভ্যাসে সঙ্গে আছে। তার নিখোঁজ হওয়ার খবর শুনে আব্বা মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়েন । আব্বার জন্য হলেও নানান ভাবে খালেদের সন্ধান করতে হয় মুমুকে । গত বছর খালেদ যখন নিখোঁজ হলো তখন নভেম্বর মাস। বাইরে ভীষণ রোদ আর বৃষ্টির দিনে মুমুকে বের হতে হয় ভাইয়ের খোঁজে । খালেদ লাল রঙের শার্ট পড়তে ভালোবাসতো। গায়ের রঙ শ্যামবরণ হওয়ায় লাল রঙ টা দূর থেকে দেখা যেত । ছাত্র হিসেবে ততটা ভালো ছিল না খালেদ । দুইবারে এসএসসি পাস করেছে। প্রথমবার যখন পরীক্ষা দিল ইংরেজিতে ফেল করল। পাস করল দ্বিতীয়বার ইংরেজিতে সি গ্রেড পেয়ে । এরপর কলেজে ভর্তি হয়েছিল । কিন্তু অনিয়মিত হয়ে পড়ে । এইচএসসি পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি । ভালো ছবি আঁকতে পারত। চাচাতো বোন সামিরার বিয়েতে বাড়ি সাজানোর সমস্ত দায়িত্ব নেই সে । কাগজ কেটে , রঙ করে কত ডিজাইনই না করল । সাধারণ বাড়িটা অসাধারণ হয়ে উঠল । হামিদ চাচা খুব খুশি হলেন , খুশি হয়ে তাকে পাঁচশ টাকাও দিয়েছিল । রাত জেগে বিয়ের বাড়িতে গান করে বাড়ি মাতিয়ে রেখে ছিল। এত আনন্দময় মানুষ মাঝে মাঝে নিখোঁজ হয়ে যায় । খালেদের প্রিয় গান ছিল-
তুমি আমার ভালো থাকার কারণ রে বন্ধু
ভালো থাকার কারণ।
ভোরের পাখিগান গাহিয়া যায় যে কোন দূরে
(আমার কথা আছেনি স্মরণ,বন্ধু ?)
তোমার আছেনি স্মরণ !

দাদাভাই আমার সঙ্গে শেষবার যাবার সময় বলে গেলেন, ‘মুমু তোর কাপড়ের ব্যবসাটা চালিয়ে যাস। তোর কাজটা বেশ ভালো রে মুমু । অনেক বড় হবি একদিন।’ আমার সেই দাদাভাই এখন নিখোঁজ । দাদার খবর পাওয়া যাচ্ছে না নভেম্বন থেকে , এখন ফেব্রুয়ারি। দাদা সিলেটে থাকতেন । তার মোবাইল নম্বরটা বন্ধ । বহুবার চেষ্টা করেছি ,কিন্তু কোনভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না । তার সঙ্গে যে কে আছে তার কোনো নামও জানি না আমরা । দাদার ছেলেবেলার বন্ধু মজিদ ভাইয়ের সঙ্গে গিয়ে একবার দেখা করলাম । কিন্তু কোন উপকার হল না।
আব্বা চান না,আমি এই ব্যবসা করি। পহেলা ফাগুনে কিছু নতুন অর্ডার এসেছিল মুমুর। অনেক বড় স্বপ্ন দেখেছিলাম। অরিক তার সেই স্বপ্নের সারথি হতে চেয়েছিল সবসময়। পাশে থেকে নতুন কিছু করার উৎসাহ দিয়েছিল । অর্ডার সব বাতিল করা হলো। আমার বুটিকের ব্যবসাটা বন্ধ হয়ে গেল। আমি আবার বন্দি হয়ে গেলাম। বড় আপার বাড়িতে যখন ছিল তখন দেখেছি তিনি কেমন করে তার পরিবার চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন! বড় বুবু বলতেন মুমু,‘জীবনের কারাগার এবং শোকের বন্ধন এক। মৃত্যুর সূচনা হওয়ার আগে, মানুষ কীভাবে দুঃখ থেকে মুক্ত থাকার আশা করতে পারে ?’ বুবুর কথা হয়ত সত্য, নয়ত বারবার কেন দুঃখ ফিরে আসে, জীবন-মৃত্যুর চক্রের মত।
একবছর পর।

আজ আমার বিয়ে। বিয়ে হচ্ছে অরিকের সঙ্গে, অরিকের চাকরি হয়েছে, না এমন কিছুই হয়নি ! আমার বিয়ে হচ্ছে অরিওন গ্রুপের চিফ মার্কেটিং অফিসার রিদওয়ানুল হকের সঙ্গে । রিদওয়ান আমাকে ভালোবাসে, আমিও রিদওয়ানকে ভালোবাসি। ভালোবাসার জন্য মানুষকে পুড়তে হয়। সবাই পুড়তে পারে না।
দাদাভাই নিখোঁজ রয়ে গেলেন। নিখোঁজ হয়ে গেল অরিক । আমি শুধু বেঁচে আছি নিখোঁজ সংবাদের ভিতর ।

জাফর জয়নাল
শিক্ষার্থী
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ-২২২৪.

Previous articleহাওরে ঘুরতে গিয়ে ট্রলার ডুবে ১৭ জনের মৃত্যু
Next articleদুর্ঘটনা নয়, বৈরুতে ভয়াবহ হামলা হয়েছে: ট্রাম্প

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here