মানবীর মুখ

30
Lipi Nasrin

মানবীর মুখ
@ লিপি নাসরিন

মোরশেদ সাহেব স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় ঝিমুচ্ছিলো বসে বসে। মাঝে মাঝে ঘুমের তোড়ে মাথাটা নুয়ে পড়ছিল। পাশে বসা ভদ্রমহিলা একটা দশ বারো বছর বয়সি বাচ্চা নিয়ে অপেক্ষা করছে। ট্রেনের জন্যে নাকি….
ভাবতে ভাবতে মোরশেদ সাহেব আবার ঘুমোয়। তখনি আধাঘুম আর ঝিমুনির মাঝে সাদা শাড়ি পরে একজন নারী তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে, আমি ফরিদা আমাকে চিনতে পারছো না? সেই যে প্রাইমারি স্কুল, বটগাছের ঝুরিতে দোল খাওয়া, টিফিন পিরিয়ডে লুকোচুরি খেলা… এখনো পারছো না? একদিন তুমি আমার বেণী ধরে টান দিলে আমি পড়ে গেলাম মাটিতে। খুব চেনা মনে হচ্ছে মোরশেদ সাহেবের নারীটিকে। কিন্তু সাদা শাড়ি কেন? হঠাৎ করে তাঁর ঝিমুনি ছুটে যায়। ফরিদা বলে চোখ খুলতেই দেখলো সামনে বসা নারীটি নেই। স্বপ্নে দেখা সেই শৈশবের সহপাঠী ফরিদার মাঝবয়সী চেহারাতো অবিকল ঐ নারীটির মত, যে তাঁকে কয়েক রাত ঘুমুতে দিচ্ছে না ঠিকমতো। মোরশেদ সাহেব হন্তদন্ত হয়ে উঠে প্লাটফর্মে এসে দাঁড়ায়। না কোথাও সেই নারী কে দেখা গেলো না…

মোরশেদ সাহেব হাতঘড়ির দিকে তাকালেন। নির্ধারিত ট্রেনটি আসার কোন সম্ভাবনা আছে কিনা জানার জন্য স্টেশন মাস্টারের রুমের দিকে এগিয়ে যেতেই একজন ভদ্রলোক রুম থেকে বের হলেন। লাইনের সমস্যার কোন সমাধান হয়েছে? ট্রেন কি আসবে? মোরশেদ সাহেব একটু উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলেন।
হ্যাঁ হ্যাঁ হয়েছে, ট্রেন আসবে, ক্রসিং এ পড়েছে সেজন্য আর একটু দেরী হচ্ছে, বলে লোকটি রুমে তালা লাগিয়ে চলে গেল। মোরশেদ সাহেব একটু যেন স্বস্তি পেলেন।রাত খুব বেশি না হলেও দশটা বেজেছে। যাত্রী, হকার ছাড়াও নানা রকম মানুষের আনাগোনা। এই মুহূর্তে একটা ট্রেন স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে গেল এজন্য হৈহুল্লোড়টা একটু বেশি। মোরশেদ সাহেব অতিথি বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন একটা আঞ্চলিক সাহিত্য সম্মেলনে। আয়োজকরা তাঁর জন্য প্লেনের যাবার ব্যবস্থা করেছিলেন কিন্তু তিনি ট্রেনে যাবেন বলে আয়োজকদের জানিয়েছিলেন কারণ ট্রেন জার্নিতে বিভিন্ন মানসিকতা, রুচি বা সংস্কৃতির মানুষের সাথে আলাপচারিতা হওয়ার সুযোগ আছে যেটি তিনি খুব পছন্দ করেন তাতে করে অনেক বিষয় নিয়ে তাঁর চিন্তার সূত্রগুলো সম্প্রসারিত হুয়ে খুব সমৃদ্ধ হয়। সাহিত্য,রাজনীতি বা সামাজিকবিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর অনেক বই আছে কিন্তু ট্রেনে ফিরতে চাওয়ার জন্যই এখন এই বিপত্তি। অবশ্য আয়োজক কমিটির দু’জন অনেকক্ষণ ছিলেন স্টেশনে তাঁকে সঙ্গ দিতে কিন্তু তিনি ট্রেন আসতে দেরী দেখে তাদেরকে বিদায় দিয়েছেন। কিছুক্ষণ আগে তাঁর মনে হয়েছিল তিনি প্লেনে গেলেই পারতেন শুধু শুধু এই বিড়ম্বনার মধ্যে পড়লেন কিন্তু ঐ ঝিমুনির মধ্যে স্বপ্ন, সামনে বসে থাকা সেই নারীর আবছা দেখা চেহারার সাথে শৈশবের ভালোলাগা সহপাঠীর চেহারার সাদৃশ্য – সবকিছু তাঁকে এক অদ্ভুত নেশাগ্রস্তের মতো তাড়িয়ে নিচ্ছে ভিতরে ভিতরে। তাঁর কৌতূহলী চোখ কিছুক্ষণ পরপরই চারিদিকের মানুষগুলোকে যেন সার্চ করছে। এত কাছে থেকেও হারিয়ে গেল ফরিদা !

একটু কিছু খাওয়া দরকার। আজকাল পাকস্থলী খালি হলেই বারবার জানান দিতে থাকে। মোরশেদ সাহেব স্টেশন থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামলেন । দু’পা হেঁটেই ওপাশের দোকান থেকে এক বোতল পানিসহ কলা, বিস্কিট আর রুটি কিনলেন। রাতে যদি প্রয়োজন হয় ট্রেনের ভিতর খেয়ে নেওয়া যাবে ভেবে স্টেশনে ফিরে এলেন। ঘোষণা হচ্ছে ট্রেন ছুক্ষণের মধ্যেই প্লাটফর্মে ঢুকবে। মোরশেদ সাহেব কী ভেবে আবার ওয়েটিং রুমে ঢুকলেন। কী অবাক ব্যাপার! তাঁর ঘোর লাগাকে বাড়িয়ে দিয়ে সেই নারী ; বাচ্চাটিকে সাথে নিয়ে বসে আছে ঠিক আগের জায়গায়। কী করবেন বা কোন কথা বলবেন কিনা ভাবতে ভাবতে তাকালেন নারীটির দিকে। ওয়েটিং রুমের স্বল্প আলোতে মুখটি ভাল করে দেখতে পাচ্ছিলেন না যেন, তার ওপর ভদ্রমহিলা মুখ নীচু করে তাঁর কাছে থাকা ব্যগটির মধ্যে কী যেন খুঁজছিলেন। মোরশেদ সাহেব একটু এগিয়ে তার সামনে দাঁড়াতেই নারীটি মুখ তুললেন- ঠিক সেই মুহূর্তে ঝমঝম শব্দ করে ট্রেনটি প্লাটফর্মে ঢুকলো …
নিজের টিকিট নির্ধারিত জায়গায় বসে তিনি ব্যাগ রাখলেন উপরে। অল্প কিছুক্ষণ ভুলে ছিলেন ফরিদাকে ট্রেনে যাত্রী, হকারদের চিৎকার চেঁচামেচিতে। একটু থিতু হয়ে বসতেই আবার চঞ্চল হয়ে উঠলেন। মন চাইছে ভদ্রমহিলা কোথায় উঠলেন সেটা খুঁজে বের করতে। ব্যাগ থেকে কলা রুটি খেয়ে পানির বোতলটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন কিন্তু কেমন যেন মাথাটা টলে উঠলো, সাথে সাথে বসে পড়লেন। পাশে বসা যাত্রীদের সাথে ছোট খাটো আলাপ হলো প্রসঙ্গত বিবিধ বিষয় নিয়ে।

মোরশেদ সাহেব খবরের কাগজটা বের করলেন কিন্তু কিছুতেই অভিনিবেশ করতে পারছেন না- মন জুড়ে সেই এক নারী তাঁর প্রান্তর ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে । কেমন দেখতে য়েছে ফরিদা এই পরিণত বয়সে, নাতি- নাতনি নিয়ে হয়তো তার আলোকদ্যুতি ছড়ানো ঘর ;ফরিদার কি মনে আছে তার কথা? কি জানি! এমন স্মৃতিময় কিছু তো নেই যার জন্য কে মনে রাখবে। খুব ছোট্ট একটা স্মৃতি- ওর বেণী ধরে টান দিয়ে ফেলে দিয়েছিলাম তার জন্য তো আমাকে শিক্ষকের বেত্রাঘাত সহ্য করতে হয়নি। তাহলে ? নিজেকেই প্রশ্ন করে মোরশেদ সাহেব। চোখ দু’টো ব্যথায় টনটন করে উঠে – সারাদিন সেমিনারের ধকল তার উপর ট্রেনের এই বিলম্ব যাত্রা। নাহ, এবার উঠতে হবে – ভেবেই মোরশেদ সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে কম্পার্টমেন্টের পেছন দিকটায় একবার চোখ বুলিয়ে সামনের দিকে এগোলেন। কয়েকটা বগির প্রায় সব যাত্রীদের মুখের দিকে তাকালেন তাঁর সেই কাঙ্ক্ষিত নারীকে পেতে- প্যাসেজ দিয়ে চলতে চলতে। খুবই ক্লান্ত লাগছিল। বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে নিজের আসনের কাছে আসতেই বিহ্বল মোরশেদ সাহেব চমকে উঠলেন ভূত দেখার মতো। এই পড়ন্ত বেলায়ও যেন বুকের মহাসাগরের ঢেউ গর্জে উঠলো। সে ঢেউ তীরে এসে কেবলি আছড়ে পড়ে কিন্তু প্রবল বিপরীত প্রক্রিয়ার ফিরে যেতে সময় নেয় অনেক বেশি।নারীটি চলে যাচ্ছে হয়তো তার আসনে কিংবা অন্য জায়গায়। কী করবে ভেবে উঠতে পারেন না মোরশেদ সাহেব। তৎক্ষনাৎ কাঁধে ঝোলানোর ব্যাগটা থেকে পানির বোতল টা বের করে নারীটির পিছু নিয়ে তার আসনটি দেখে আসেন। অনেক সময় অনেক আসন ফাঁকা থাকে যাত্রী নেমে গেলে – কিন্তু দেখা যায় পরবর্তী স্টেশনের যাত্রীরা সেসব আসন ভরিয়ে ফেলেন। আশে পাশে ক’টা সিট ফাঁকা ছিল, দু’একজন হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে আছে। মোরশেদ সাহেব একবার ভাবলেন তল্পিতল্পা নিয়ে এখানে নারীটির আশেপাশে কোথায় বসে যেতে কিন্তু নিজের কাছে নিজেকে কেমন হেংলা মনে হতেই তিনি সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলেন। কোনভাবেই ফরিদার ভাবনা তাঁকে রেহাই দিলো না ,আলোকলতার মতো জড়িয়ে জড়িয়ে শীর্ষদেশ পর্যন্ত উঠতে থাকলো। কিন্তু ফরিদা কেন বরং রিনিকেই তাঁর ভাবনায় জড়িয়ে নেবার কথা।পলোগ্রাউন্ড স্কুলে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত ফরিদা পড়েছিল তারপর অন্য স্কুলে চলে গিয়েছিল কিন্তু রিনিকে সহপাঠিনী হিসেবে পেয়েছিলেন ইন্টারমিডিয়েট ক্লাস পর্যন্ত।ক্লাস ফাইভে থাকতে একবার রিনির জন্য যেচে মার খেয়েছিলেন বিনা দোষে। সেই অমল ধবল বয়সে না বুঝলেও এখন কেমন যেন সেসব স্মৃতি বোধের গভীরে কোথাও তার নিরঙ্কুশ অধিকারের দ্যোতনা জাগায়। তারপর অনেকদিন পর রিনিকে তিনি দেখেছিলেন রোকেয়া হলের সামনে । মোরশেদ সাহেব বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে রাস্তা পার হচ্ছিলেন হঠাৎ একটা মেয়ে রিক্সা থামিয়ে তাঁকে ডেকে বললেন, আমি রিনি, চিনতে পারছো না? মোরশেদ সাহেব রিনিকে চিনতে পারেননি। এ জন্য তাঁর নিজেকে বোকা লাগে একটু । যার সাথে কলেজ অব্দি পড়লেন তাকে তিনি চিনতে পারলেন না। এতসব স্মৃতি তাঁর নিউরণকে হঠাৎ কেন বিদ্ধ করছে মোরশেদ সাহেব বুঝতে পারছে না। সেই যে একটুখানি ঝিমুনি তারপর থেকে সব যেন টেপ রেকর্ডারের ফিতার মতো জট পাকিয়ে যাচ্ছে। পলোগ্রাউন্ড স্কুল, রিনিকে নির্দোষ বলাতে বিনা দোষে গণিতের স্যারের কাছে মার খাওয়া ,গণিতের স্যারের প্রতি অসাধারণ মুগ্ধতা সবকিছু যেন সুপ্ত আগ্নেয়গিরির কোনরকম পূর্বাভাস ছাড়াই জেগে উঠার মতো তপ্ত লাভা ছড়িয়ে চলেছে। নারীটির কি সাদা শাড়ি পরা ছিল? নাতো, হালকা নীলের মধ্যে সুতোর কাজ আর মাঝারি চওড়া পাড়। মাথায় আঁচল তোলা। কী মায়াময় একখানা মুখ ।লাবণ্য ঠিকরে পড়ে এক নীলাভ আলোয় তাঁর অবয়ব পূর্ণার্দ্র স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে রেখেছে যেন চারপাশ। ফরিদা কি এমন দেখতে ছিলো? মনে নেই তো। থাকবেই বা কেন। একটা নয়-দশ বছরের মেয়ে তার যৌবনোদ্দীপনা পেরিয়ে এই পড়পড় বেলায় কেমন হয়েছে তা তিনি কিভাবে জানবেন? তবে স্বপ্নে দেখা ফরিদার মুখশ্রীর সাথে নারীটির যে ভীষণ মিল! তিনি উঠে পড়েন অনেকটা যেন তাড়িত হয়ে। একটু দূরে একটা আসনের গায়ে হেলান দিয়ে কয়েক মূহূর্তে চাহনি,, নারীটি তাঁর দিকে অন্য অনেক কিছু অপ্রয়োজনীয় দেখার মতো করে তাকালো। মোরশেদ সাহেব চমকে উঠলেন! তবে কি সে কিছু ভাবছে তাঁকে দেখে? আসনের একজন অল্প বয়সী পুরুষ যাত্রী উনার এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে বললো, চাচা, কতদূর যাইবেন? ঢাকা যাবো বলতেই ছেলেটি বললো, বসার সিট নম্বর আপনাকে দেয়নি? মোরশেদ সাহেব উত্তর দেবার আগেই ছেলেটি আবার বলে উঠলো, সিট না থাকলে আপনি সিটে বসেন, আমি সামনের স্টেশনে নাইমা যাবো। না না ঠিক আছে, ধন্যবাদ, বলে মোরশেদ সাহেব নিজের সিটে গিয়ে বসলেন । পকেটের ফোনটা বেজে উঠলো – কী ভুল হয়ে গেল এই দীর্ঘ সময়ে একবার ও নাহারকে ফোন করা হয়নি। বেচারি এতক্ষণ কোন খবর না পেয়ে ফোন করেছে।

বলো নাহার।
তুমি এখন কোথায় ? সেই যে বললে ট্রেন লেট তারপর আর তো কোন খবর নেই। নাকি আজ আসবে না?
না না আমি আসছি। সকাল সাতটা/ আটটা নাগাদ হয়তো পৌঁছে যাবো।
ঠিক আছে। সাবধানে এসো। কিছু খেয়েছো রাতে?
খেয়েছি। তুমি চিন্তা করো না , ঘুমিয়ে পড়ো। সরি তোমাকে জানাতে ভুলে গিয়েছি।
এ আর নতুন কী? রাখলাম, বলে ওপাশ থেকে মোরশেদ সাহেবের স্ত্রী কল কেটে দিলেন।

যে মানুষটা সুখে-দুঃখে তাকে ঘিরে রেখেছে শীতল বাতাসের মতো স্পর্শ দিয়ে তাঁকে উৎকণ্ঠিত রাখা তাঁর একদমই ঠিক হয়নি। কিন্তু সে চিন্তা মোরশেদ সাহেবের ক্ষণিকের। উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো আজ ফরিদা নাম্নী একজন তাঁর সমস্ত চেতনা ঘিরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে- গভীর অরণ্যে, বিশাল জলরাশি থেকে শুষ্ক বাতাস জল বয়ে এনে যেমন করে বৃক্ষরাজীকে পুষ্প,ফলে শোভিত করে ঠিক তেমন। কখন জানি অজান্তে এক অনির্বচনীয় আনন্দ তাঁর মনকে দোলা দিয়ে তাকে রেখেছে প্রাণপ্রাচুর্যময়।জানালা দিয়ে অন্ধকারে তাকিয়ে থাকেন তিনি। অনেক দূরে জ্বলা কিছু টিমটিমে আলো ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। একেকটা স্টেশনে ট্রেন থামে। যাত্রীদের দ্রুত নেমে পড়া আবার এক দলের উঠে আসা, কুলি ,হকারদের চঞ্চলতায় মুখরিত হয়ে উঠে একটু আগে পেছনে ফেলে আসা বাইরে রাতের গাঢ় নিস্তব্ধতা। ট্রেন চলতে শুরু করে, রাতের ক্লান্ত যাত্রীদের চোখে নেমে আসে ঘুমিয়ে আবিলতা। মোরশেদ সাহেব আবারও ডুবে যান নিজের মধ্যে একদম একা। লেখক হিসাবে খ্যাতি, জনপ্রিয়তা যদি কিছু হয়ে থাকে তাহলে তাঁর স্ত্রী নাহারের অবদানকে অগ্রায়ণ করে তাকে অনুসরণ করতে হবে। সংসারের গুরু দায়িত্ব এই মানুষটি নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে তাঁকে লেখালেখির জন্য নির্বিঘ্ন সময় উপহার দিয়েছেন। মোরশেদ সাহেব একবার এক টিভি সাক্ষাৎকারে তাঁর স্ত্রীর প্রসঙ্গ আসতেই সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, এমনকি তিনি যদি অন্য কোন নারীর সাথেও জড়িয়ে পড়েন তাহলেও বুঝি সে হাসিমুখে সেটি মেনে নেবেন। আসলে কি তিনি ঠিক বলেছিলেন নাকি তিনি স্ত্রীর মাহাত্ম্যকে বড় করে দেখাতে যেদিন ঐ বুলি আওড়েছিলেন? কোন স্ত্রীর পক্ষে কি এই একটিমাত্র কাজ সম্ভব? দীর্ঘ যুগল জীবনে এই নিঃসন্তান দম্পতির একজনের জন্য সেটির প্রায়োগিকতা কতটুকু মোরশেদ সাহেব জানেন না বা তার প্রয়োজনীয়তাও তিনি কখনো অনুভব করেননি।

ট্রেন যমুনা সেতু পার হয়ে গেল। চারিদিকে হালকা আলোয় অন্ধকারের পর্দা অপসৃয়মান প্রায়। মোরশেদ সাহেব চারিদিক তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। একটু চা হলে ভালো হতো। ট্রেনের ক্যান্টিনের লোকগুলোকে দেখা যাচ্ছে না আর।অগত্যা তিনি সেই নারীকে বহনকারী কামরার দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু কোথায় সেই নারী? তিনি কি ভুল কামরার এলেন? আরো কয়েক কামরা সামনে গেলেন। নাহ, কোথাও তিনি নেই । মোরশেদ সাহেব কেমন হতবিহ্বল হয়ে গেলেন। তাহলে কি রাতেই কোন স্টেশনে ফরিদা নেমে গেছে? বুকের ভিতর- কোন মূল্যবান কিছু হারানোর মতো, কষ্টগুলো গিরগিটির মতো যেন তরতর করে পেটের মধ্যে থেকে দলা পাকিয়ে গলার কাছে উঠে এলো। মোরশেদ সাহেবের খুব তেষ্টা পেলো কিন্তু জল কোথায়? গলা যেন শুকিয়ে ঝুরঝুরে মাটির মতো ছড়িয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। নিজের জায়গায় ফিরে এলেন তিনি। ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে পান করলেন তারপর তাকিয়ে রইলেন দূর মাঠের গরম বাষ্পাচ্ছন্ন ধূসরময়তার দিকে।

প্রায় দশটা নাগাদ মোরশেদ সাহেব বাসায় পৌঁছালেন। স্নান সেরে বসলেন খাবার টেবিলে।
তোমাকে এতো ক্লান্ত লাগছে কেন? জার্নিতে তো তুমি খুব বেশি ক্লান্ত হওনা, নাহার প্লেনে ভাত বাড়তে বাড়তে বলে।
কাল খুব ধকল গেছে, হয়তো সেজন্য , মোরশেদ সাহেব স্ত্রীর দিকে না তাকিয়েই উত্তর দেয়।
তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গেছি?
কী কথা? মোরশেদ সাহেবের ভিতরটা কৌতূহলী হয়ে উঠে। স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষায় থাকেন।
তোমার এক বন্ধু টেলিফোন করেছিলেন বাসায় তোমার মোবাইল বন্ধ পেয়ে আমার তো অনেক বন্ধু নাম কী? মোরশেদ সাহেব জানতে চান।
নামটা কী যেন বললেন মনে করতে পারছি না। তোমাদের এক বান্ধবী ছিল না নাম ফরিদা?
মোরশেদ সাহেব বাক্যের সমাপ্তির জন্য স্ত্রীর মুখের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকেন।
তিনি গতকাল হার্টঅ্যাটাকে মারা গেছেন। নাহার বাক্যে পূর্ণচ্ছেদ বসিয়ে দেয়।
মোরশেদ সাহেব ক্ষণিক স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন- মাথাটা নুয়ে পড়ে টেবিলে, তাঁর হাতের ধাক্কায় কাঁচের গ্লাস পড়ে গিয়ে টাইলসের মেঝেয় ঝনঝন শব্দ করে ওঠে।

লিপি নাসরিন
সহযোগী অধ্যাপক ও লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here