জনসন অ্যান্ড জনসনের দেড় কোটি ত্রুটিপূর্ণ টিকা আমাদের জন্য কতটুকু উদ্বেগজনক?

10

ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় বুধবার প্রায় দেড় কোটি ডোজের সমপরিমাণ ভ্যাকসিন নষ্ট করে ফেলার কথা স্বীকার করে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন।

ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় বুধবার প্রায় দেড় কোটি ডোজের সমপরিমাণ ভ্যাকসিন নষ্ট করে ফেলার কথা স্বীকার করে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে প্রতিষ্ঠানটির ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী কারখানা ইমারজেন্ট বায়োসলিউশনের গাফিলতির কারণে ঘটে এই দুর্ঘটনা।

বিভিন্ন বিতরণ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগেও মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে প্রস্তুতকারী কারখানাটির বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগের তীর ওঠে।

কোভিড ভ্যাকসিনের ‘ত্রুটি’ চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বিশ্বব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম।

এর আগেও এরকম দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না এবং জনসাধারণ বিষয়টিকে কীভাবে গ্রহণ করবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির ক্যারে বিজনেস স্কুলের অপারেশনস ম্যানেজমেন্টের সহযোগী অধ্যাপক টিংলং দাই-এর সাক্ষাৎকার নেন প্রতিবেদক মলি ওমস্টেড। সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হল। 

টিংলং দাই: প্রথমত, পরিস্থিতি এখনও খুব একটা পরিষ্কার নয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মূল প্রতিবেদনটির বক্তব্য অনুসারে, ভ্যাকসিনের উপাদান গুলিয়ে ফেলায় দেড় কোটি ডোজ ভ্যাকসিন ফেলে দিতে হয়েছে।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, কারখানায় অ্যাস্ট্রেজেনেকা এবং জনসন অ্যান্ড জনসন দুই ধরনের ভ্যাকসিন মিশিয়ে ফেলায় বেশ বাজে ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বিষয়টি আসলেই খুব বাজে। এদিকে, গতকাল ইমারজেন্ট বায়োসলিউশনের সিইও সিএনবিসিতে এসে দাবি করেন যে, দুইটি ভিন্ন ভ্যাকসিন মিশিয়ে ফেলার কোনো ঘটনা আসলে ঘটেনি।

তিনি বিষয়টিকে ‘পরিমাণগত ত্রুটি’ বলার চেষ্টা করেন। তবে, তিনি আসলে কী বুঝাতে চেয়েছেন, তা পরিষ্কার করেননি। সবদিক বিবেচনায় আমার মনে হয় যে, প্রকৃত ঘটনা কী তা এখনো আমাদের অজানা।

কেননা, আমরা জনসন অ্যান্ড জনসনের কাছ থেকেও কোনো তথ্য পাইনি। ইমারজেন্সও আমাদের কোনো অর্থবহ ব্যখ্যা বা তথ্য দিতে পারেনি।

আমরা যেটা জানি তা হল, দেড় কোটি ডোজের জনসন অ্যান্ড জনসনের বিশাল ভ্যাকসিন ব্যাচের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্ক সাত শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকাদানের জন্য এই ব্যাচটি যথেষ্ট ছিল।

এই বিশাল সংখ্যক ভ্যাকসিন দ্বারা মেরিল্যান্ড, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া এবং আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে টিকা দেওয়া যেত। কিন্তু, এই ভ্যাকসিনগুলো আমাদের ফেলে দিতে হয়েছে।

আর তাই, বাইডেন প্রশাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) ইমারজেন্ট বায়োসলিউশনসের প্রতি জনসন অ্যান্ড জনসনকে নজরদারি বৃদ্ধির নির্দেশনা দিয়েছে। এছাড়া, বাল্টিমোরের ঐ কারখানাটি এখনো এফডিএ অনুমোদিত নয়। কারখানাটির অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও বিলম্বিত হতে চলেছে।

তবে মনে হয় না যে, এই ঘটনার ফলে জনসন অ্যান্ড জনসনের সরবরাহের সময়সূচীতে পরিবর্তন আসবে। মে মাসের শেষ নাগাদ প্রতিষ্ঠানটির দশ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করার কথা। সম্ভবত সেটা নির্দিষ্ট সময়ের মাঝেই আসবে। এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এতটুকুই তথ্য আছে।

ঘটনাটি কতটুকু অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন?

ঘটনাটি মোটেই স্বাভাবিক নয়। এটা এক ধরনের ত্রুটি- তবে তা আগেও ঘটেছে। আমি ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করি। এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটে। ফ্লু বা সর্দিজনিত ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারকরা সময়মতো ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে চান। কিন্তু, এফডিএ আগে থেকে তাদের বলে না যে ফেব্রুয়ারি বা মার্চ নাগাদ ঠিক কোন ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে হবে।

এদিকে, ভ্যাকসিন তৈরিতে সময় লাগে ছয় মাসের মতো। আর তাই, কিছুক্ষেত্রে ভ্যাকসিন উৎপাদনকারীরা ঠিকভাবে জানার আগেই তাদের উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে দেয়। শেষ পর্যন্ত তারা যা প্রস্তুত করে তার সাথে এফডিএ’র চাহিদা মিলে না। তখন এই ভ্যাকসিনগুলো তাদের ফেলে দিতে হয়। এই ঘটনাগুলো কয়েক বছর অন্তর অন্তর ঘটে।

আমার ২০০৪ সালের আরেকটি ঘটনার কথা মনে আছে। যুক্তরাজ্যের একটি ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী কারখানা সেবার ভ্যাকসিন গুলিয়ে ফেলে। পরিদর্শকরা বেশ বড় ধরনের মিশ্রতা বিষয়ক ত্রুটি খুঁজে পায়। অনুমোদিত মাত্রার তুলনায় তারা ভ্যাকসিনে এক হাজার গুণ বেশি মাত্রায় ব্যাক্টেরিয়া পায়। তখন তারা পুরো কারখানাটি বন্ধ করে দেয়। সেই সাথে সব টিকা ধ্বংস করে ফেলে। ফলে, সে বছর টিকা নিয়ে মারাত্মক সংকটের দেখা দিয়েছিল।

কোভিড ভ্যাকসিন নিয়ে আরেকটি গণ্ডগোল সৃষ্টি করেছিল অ্যাস্ট্রেজেনেকা। আপনার সম্ভবত গত নভেম্বরের কথা মনে আছে। অ্যাস্ট্রেজেনেকা যখন তাদের ক্লিনিকাল ট্রায়াল প্রকাশ করে, আমরা দেখতে পাই যাই, উৎপাদন ত্রুটির কারণে তারা তিন হাজার রোগীকে পুরো ডোজের বদলে কেবলমাত্র অর্ধেক ডোজ টিকা দিয়েছে। তো এই বিষয়গুলো আসলে প্রায়ই ঘটে। তবে তারপরও দেড় কোটি সংখ্যাটি বেশ বড়। এত বিশাল মাত্রায় ত্রুটি খুঁজে পাওয়ার ঘটনা বিরল।

আপনি কী জানেন এ ধরনের ঘটনা কীভাবে ঘটে?

আমাদের কাছে কোনো সূত্র নেই। হয়তো তারা পরিমাণগত কোনো ভুল করেছে। কিংবা, হয়তো তাদের কর্মীদের যথেষ্ট প্রশিক্ষণ ছিল না। ইমারজেন্ট বেশ ছোট একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা বিপুল সংখ্যক কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি আপনাকে তাদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও বাধ্যবাধকতা অনুসরণও জরুরি। আমরা এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে কিছু জানি না।

আর তাই কারখানায় ঠিক কী ঘটেছিল তার উত্তর জানা জরুরি। কেননা, ঘটনাটি ফেব্রুয়ারি মাসে ঘটে। আর এখন আমরা এপ্রিলে চলে এসেছি। এর মাঝে দুই মাস কেটে গেছে।

আমার মনে হয় না, ঘটনা খুঁজে বের করতে এত সময় লাগার কথা। তাদের ক্যামেরা আছে। এমনকি এফডিএর কাছে যদি এখন সব তথ্য থাকে, তাতেও আমি অবাক হব না। আমার ধারণা তারা প্রকৃত ঘটনা জানে। আমার মনে, হয় তাদের ঘটনাটির বিষয়ে আরও স্বচ্ছ থাকা উচিত।

বিষয়টি এখন জনসন অ্যান্ড জনসনের প্রতি জনসাধারণের আস্থার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কেবলমাত্র সময়মতো ডোজ পাওয়া নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু আমাদের সময় অনুযায়ী চাহিদার কথাও বিবেচনা করতে হবে। যখন ভ্যাকসিন আসলেই সহজলভ্য হবে, মানুষ যেন আত্মবিশ্বাসের সাথে সেই ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে রাজী হয়। আমার মনে হয়, আমাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে তাদের সাহায্য করা উচিত।

ক্রুটির দিক থেকে ভ্যাকসিনের উপাদানগুলোর কি অন্যান্য ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের চাইতে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ?

আমার মনে হয়, অন্যান্য ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের তুলনায় ভ্যাকসিন বেশ ভিন্ন। কেননা, এটা সুস্থ মানুষের উপর প্রয়োগ করা হয়। আর আপনি যদি কোটি কোটি সুস্থ মানুষের উপর কোনো কিছু প্রয়োগ করতে যান, সেক্ষেত্রে তা অবশ্যই উচ্চ মানসম্পন্ন হওয়া জরুরি। আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে আপনার ভ্যাকসিন নিয়ে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ুক। আগেও এমন হয়েছে। ১৯৫৫ সালে, ত্রুটিপূর্ণ পোলিও টিকা গ্রহণের ফলে শতাধিক মানুষ সংক্রমিত হয়।

এখানে অনেক উপাদান আছে। অনেকগুলো ধাপ পার করে ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে হয়। আর তাই সেটা ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। সে কারণেই কিন্তু ভ্যাকসিনের জন্য আমরা পরীক্ষাও করি বেশি। ফ্লু ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ সময় মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার পেছনে চলে যায়। বাকি ৩০ শতাংশ সময় উৎপাদন কাজে ব্যয় হয়।

আমরা ফাইজারের কাছে শুনেছি যে তারা মান নিয়ন্ত্রণের পিছে অর্ধেক সময় ব্যয় করছে। এখন আমরা ধীরে ধীরে শিশু থেকে নবজাতকদের উপর এই টিকা প্রয়োগের বিষয়ে আলোচনা করছি। এটা এক বিশাল দায়িত্ব। কোনোকিছুই ভুল হওয়া চলবে না। পুরো বিষয়টি সঠিক হতে হবে।

এই ঘটনা থেকে মানুষের কী বোঝা নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

সারকথা হল জনসন অ্যান্ড জনসনের দুর্ঘটনাটি নতুন কিছু নয়। হয়তো এই কারখানার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। কিন্তু, এর আগে প্রায় সব বড় ব্র্যান্ড এবং ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এফডিএর কাছ থেকে মান নিয়ন্ত্রণ লঙ্ঘনের বিষয়ে বেশ কঠোর বার্তা পেয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ক নীতিমালা ইত্যাদি অনুসরণ না করার জন্যও তাদের দোষারূপ করা হয়েছে।

যেহেতু একাধিকবার পরীক্ষা চালানো হয়, তাই আমরা সর্বশেষ পণ্যের বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারি। ঠিকমতো মান যাচাই ব্যতীত ভ্যাকসিন বাজারে আসার সম্ভাবনা নেই। প্রক্রিয়াটি অনেক বিশাল।

প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই ভ্যাকসিন উৎপাদনের পূর্বে জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আপনি এফডিএর ফলাফলগুলো দেখলে, বিষয়গুলোকে ব্যর্থতা বলেই মনে হবে। তাদেরকে যেন রাতারাতি ক্লাসের সবথেকে খারাপ ছাত্র থেকে এ গ্রেড ছাত্র হয়ে উঠতে হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাই ঘটে।

আর তাই অনিয়ম ও দুর্ঘটনার বিষয়টি বেশ স্বাভাবিক। তবে, দেড় কোটি ডোজ ভ্যাকসিন নষ্ট করে ফেলা মোটেই স্বাভাবিক নয়। তারপরও এগুলো ঘটে চলেছে। তবে, সর্বশেষ ফলাফল নিয়ে আমাদের নিশ্চিত থাকা উচিত।

টিবিএস

Previous articleঅটিজম নিয়ে আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘প্রাচীর পেরিয়ে’
Next articleঘোড়ায় চড়ে পিকেটিং করা হেফাজত নেতা হাছানকে রাঙামাটিতে গ্রেপ্তার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here