ছোটগল্প: মোল্লা বউয়ের হিল্লা বিয়ে

101
Rubaed Foysal Al-Masum
Rubaed Foysal Al-Masum

রুবায়েত ফয়সাল আল-মাসুম এর ছোটগল্প: মোল্লা বউয়ের হিল্লা বিয়ে

প্রথম পর্ব

সারারাত না ঘুমিয়ে রাত দুইটা থেকে বসে আছে লেবুমোল্লা, ভাবছে আজ রাত পোহায় না কেনো? হঠাৎ করে রাত কি আজ লম্বা হয়ে গেলো? কিছুই তার বুঝে আসছে না। অবশেষে মসজিদের মাইকে ফজরের আজানের সুর ভেসে আসছে, আর লেবুমোল্লা স্বস্থির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। ফজরের নামাজ আদায় করার জন্য তাড়াতাড়ি লেবুমোল্লা জায়নামাজ বিছিয়ে নামজে দাড়িয়ে গেলেন, কিন্তু নামাজের আগে পবিত্রতার জন্য কি ওজু করেছেন কিনা সেই বিষয়টি তার মাথায় নেই। প্রথমে সুন্নত নামাজ আদায় করছেন, কিন্তু সুন্নত নামাজের দ্বিতীয় রাকাআতে ফরজ নামাজ মনে করে সুরা জোরে পড়ছেন। আবার প্রথম রাকাআত নামাজে কোন সুরা পড়েছেন আজ সেটাও তার মনে নেই।

সকালবেলায় লেবুমোল্লার এই ধরনের আজব আজব কার্যকলাপে প্রথম বউ সেতারা বেগমের ঘুম ভাঙে। সেতেরা বেগমের বয়স মোটামুটি ষাটের কাছাকাছি  হয়েছে, তবে দেহের গড়ন দেখে সেতেরা বেগমের বয়স বুজার কোনো উপায় নেই, সেই কৈশোরবেলায় লেবুমোল্লার ঘরে বউ হয়ে এসেছেন এই বাড়িতে, দুই ছেলে দুই মেয়েকে বড় করে বিয়ে শাদীর পর্ব শেষ। স্বামীর সুখের কথা ভেবে নিজেই ঘরে সতীন আনতে লেবুমোল্লাকে অনুরোধ করেছেন। অত্যন্ত উদার আর খোলা মনের মানুষ সেতারা বেগম। তাই এই বাড়ির কার চরিত্র কেমন তা সেতারা বেগমের চেয়ে বেশী ভালো আর কেউ জানার কথা না। সকাল হতে লেবুমোল্লার  উল্টোপাল্টা কাজকর্ম দেখেই সেতারা বেগম অনুমান করেছেন ঘরে একটা কিছু হয়েছে।আপনার তো দেখি চোখ লাল, আপনি মনে হয় সারা রাত্রে এক ফোটাও ঘুমান নাই?কি হইছে? ঘটনা কি?আমারে কন দেখি। ছোট কি রাতের বেলা ঝগড়া করছে নাকি? 

ছোট ঝগড়া করবো কেন? আমার কিছুই হয় নাই আমার এমনিতেই ঘুম হয় নি। চোখে পোকা পড়ছে, এজন্য চোখ লাল।যাও তুমি ঘরে যাও তো। সকাল না হতেই নাসিমা বেগম বিলাপ করে সুর তুলে কাঁদছে। বাড়ির ছোট বউ নাসিমা বেগম, অল্প বয়সের মেয়ে। গরীব ঘরের অল্প শিক্ষিত সুন্দরী মেয়ে , অভাবের তাড়নায় লেবুমোল্লার মতো একজন বয়সি একটা লোকের সাথে বিয়ে হয়েছে। সেতারা বেগম ভাবলেন রাতে কোন কিছু নিয়া দুইজনের মধ্যে বনিবনা হয়নি, তাই মনে হয় কান্নাকাটি করছে।

ঘটনার কিছু বুঝার আগেই লেবুমোল্লা পশ্চিম দিকে জঙ্গল বরাবর মসজিদ পানে হাটা শুরু করেছে। এত সকালবেলা লেবুমোল্লাকে সহজে কেউ বাহিরে দেখতে পায় না। কারণ নামাজের পর লেবুমোল্লা আরও কিছুক্ষণ ঘুমায়।  হাটতে হাটতে লেবুমোল্লা সোজা মসজিদের ইমাম সাহেবের বাড়িতে গেছেন। ইমাম সাহেব লেবুমোল্লার একজন জনপ্রিয় মানুষ, হবেনই বা কেনো? লেবুমোল্লা যখন দ্বিতীয় বিয়ে করে তখন ইমাম সাহেব লেবুমোল্লার পক্ষে মাসায়ালা দিসেন। গ্রামের মানুষ যখন লেবুমোল্লাকে ছি ছি করতেছিলো তখন ইমাম সাহেব লেবুমোল্লার পাশে ছিলেন। একজন পুরুষ মানুষ ক্ষমতা থাকলে চারটি বিয়ে করতেই পারে। এতে দোষের কিছু নাই। মোল্লাসাব তো আর পরকিয়া করেন না। গ্রামের মানুষের কঠিন সমালোচনার হাত থেকে সেদিন লেবুমোল্লাকে ইমাম সাহেব বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তাই আজও ইমাম সাহেবের কাছে অনেক আশা নিয়ে এসেছেন লেবুমোল্লা। কোন একটা বুদ্ধি যদি বের হয়।

ইমাম সাব কি বাড়ি আছেন? দরজা খুলে বের হয়ে আসলেন ইমামসাবের ছেলে।বলি এত সকালবেলা মোল্লাকাকা কি ব্যাপার, এত সকালে আব্বাকে কেনো খুজতেছেন? আব্বা তো টয়লেটে গেছেন। লেবুমোল্লা দৌড় দিয়ে টয়লেটের কাছে গিয়ে বললেন, হুজুর আপনি তাড়াতাড়ি বাহিরে আসুন আপনার সাথে আমার জরুরী কথা আছে। হুজুর দৌড়ের উপর কাজ সেরে বের হয়ে বলছেন” আর বলবেন না মোল্লাসাব কালকে এক বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে পেটের বারোটা বেজে গেছে। তো মোল্লাসাবের বাড়ীতে কি কেউ মারা গেছেন নাকি? আরে না কেউ মারা যায় নি, আপনি আমার সাথে আসুন পরে বলছি। মোল্লা সাব আমি কেবল এস্তেঞ্জাখানা থেকে আসছি আপনি বৈঠকখানায় কিছুক্ষণ বসুন আমি ওযু করে আসছি। আজকে লেবুমোল্লার আর দেরি সইছে না।
ইমাম সাব হুজুর আপনি আমারে একখানা বুদ্ধি দেন, আমার ঘরে কাল রাতে একটা অঘটন ঘটে গেছে। আমি বুজতেছি না কি করবো। কেনো মোল্লা সাব হইছে টা কি?গতকাল রাতের বেলা আমি আপনার ছোটভাবির সাথে ঘুমাতে গেছি। রাতে যা গরম পরছে, কারেন নাই, বাহিরে এক ফোটাও বাতাস নাই। একদিকে গরম আর অন্যদিকে মশার কামুড়। মশারি খাটালে আমি আবার ঘুমাতে পারি না, ফাফুর লাগে। তাই কয়েল জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম। তাহলে তো ঠিকই আছে মোল্লাসাব আমারও একই অভ্যাস, কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাই বললেন ইমাম সাব। 

আমার আবার বিদেশি কয়েল। আমার ভাগিনা কুয়েত থেকে পাঠাইছে, কোনো ধোঁয়া নাই, কোনো ঝামেলা নাই, মশা একটাও থাকে না, গতকালই একটা বের করছি একবারে নতুন। আপনার লাগলে একটা নিয়ে যাবেন মোল্লাসাব। আমার কাছে অনেকগুলো আছে। আরে ইমাম সাব সমস্যা তো শেষ হয় নি। আপনার ভাবি কয়েলের ধোঁয়া একেবারে সহ্য করতে পারে না। কয়েলের গন্ধে নাকি তার পেট ফুলে যায়, দম বন্ধ লাগে আর ফ্যান ছাড়লে শীত লাগে। এই নিয়া দুইজনের মধ্যে চরম ঝগড়া। ঝগড়ার এক পর্যায়ে আপনার ভাবির গায়ে একটা কষে থাপ্পড় দিসি। 

ওসতাগফিরুল্লাহ, ওসতাগফিরুল্লাহ, মোল্লাসাব আপনি এই অকাম টা করলেন কেমনে? ভাবিসাব যদি এখন আপনার নামে নারী নির্যাতনের মামলা করে তবে  আপনারে তো পুলিশে ধরে নিয়া যাবো। ইমাম সাব আপনি এত বেশী বুজেন কেনো? কথা শেষ করবার দেন, ঝামেলা আরেক জায়গায়। আচ্ছা মোল্লাসাব কন কন। তখন রাগ আমার চরমে উঠে গেছে। এক কথা দুই কথা আমিও কইছি আপনার ভাবিও কইছে। শেষে রাগ না থামাতে পেরে আমি বললাম তুই আমার সাথে কথা বলিস না। তুই যদি আমার সাথে আগে কথা বলিস তবে তুই তিন তালাক, তোর মত বউ আমার লাগবো না। পরে রাতের বেলা বউ আমার পায়ে ধরে মাফ চাইছে, বলছে আমারে তুমি মাফ করে দাও, আমি আর মশারি টানামু না। এখন হিসাব মতো তো আমার বউ তালাক হয়ে গেছে।  আপনি আমারে বুদ্ধি দেন কেমনে কি করা যায়?

নাউজুবিল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ মিন জালেক, মোল্লাসাব আপনি বুড়া বয়সে করলেন কি এইটা? সমাজের মানুষ এখন আপনারে কি বলবে এখন? মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে আপনার? আমি আপনার সাফাই বলে মেয়ের বাপকে রাজি করালাম, এখন আপনি এই কাজ করলেন মোল্লা সাব?

ইমাম সাব আমি তো এমনি এমনি বলি নাই রাগ করে বলছি,  মাথা ঠিক ছিলো না। এখন একটা মাসায়ালা দেন ইমামসাব আমি কি করবো? আপনার এই কাজের কোন মাসায়ালা আমার জানা নাই। আপনার বউ তালাক হয়ে গেছে, আপনার বউ আপনার জন্য হারাম হয়ে গেছে, বৈধ করার কোন বুদ্ধি নাই।
নাসিমা বেগমের কান্নার সুর শুনে সেতেরা বেগম চুপিসারে কাছে যায়। কাছে গিয়ে গতরাতের ঘটনার ব্যপারে জিজ্ঞেস করে। চুপিসারে নাসিমা বেগমের মুখে বর্ণনা শুনে সেতেরা বেগমের মাথায় হাত। এই অল্প বয়সের একটা মেয়ে তালাক হয়ে গেলে জামাই ছাড়া সে থাকবে কেমন করে? 

সেতেরা বেগম ঘটনাটা ধামাচাপা দেয়ার অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু গ্রামে এসব খবর বাতাসের আগে পৌঁছে।  কেমন করে ঘটনাটা  নুরজাহান বানুর কানে পৌঁছে যায়। নুরজাহান বানু হলেন স্বামী পরিত্যক্তা লেবুমোল্লার দুঃসম্পর্কের একজন খালাতো বোন। মোল্লাসাবের দ্বিতীয় বিয়ের সময় নুরজাহান বানুর মনে অনেক স্বাদ ছিলো মোল্লা সাবের ঘরে বউ হয়ে আসাবে। এই নুরজাহান বানুর কার্যকলাপ মোল্লাসাব একেবারেই পছন্দ করেন না। কারন তার পেটে কোন কথাই হজম হয় না। মুহূর্তের মাঝেই তালাকের কথা গ্রামের এই প্রান্ত থেকে সেই প্রান্তে চলে গেছে। গ্রামের ছোট-বড় সকলেই এখন লেবুমোল্লার তালাকের কথা জানেন।

চলবে…….

লেখক:
প্রকৌশলী রুবায়েত ফয়সাল আল-মাসুম
সহকারী প্রকৌশলী
বিএডিসি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ক্ষুদ্রসেচ জোন,
ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
ই-মেইল: [email protected]

Previous articleমহামারির মধ্যে তিনগুণ খাদ্য উৎপাদনে কৃষকরা সব ধরনের সহায়তা পাচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী
Next articleবীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের শাহাদাৎ বার্ষিকী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here