কোভিড-১৯ প্রতিরোধে স্পেস নয় পিস(শান্তি) জরুরি

19
Preety Lata

কোভিড-১৯ প্রতিরোধে স্পেস নয় পিস(শান্তি) জরুরি

আমি অনেকটা জলে ভাসা পদ্মের ন্যায়। তবে ছলনা পাইনি, পেয়েছি হোম কোয়ারেন্টাইন। হ্যাঁ আমি অনেক আগে থেকেই এই চার দেয়ালের হোম কোয়ারেন্টাইনে বন্দী। গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ করে যেদিন বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলাম সেই অবধি আজও সেই হোম কোয়ারেন্টাইন পড়ে আছি। পার্থক্য টা চার অথবা পাঁচের নয়,গুনে গুনে সাড়ে এগারো বছরের। আশির্বাদের দিন পাশের বাড়ির জ্যাঠিমা বলেছিলেন, টাকা পয়সা থাকলে বয়সের দিক না তাকানোই ভাল। সিনেমায় তো আর নামছে না। মা কিছুটা চুপচাপ ই রইলেন। শ্বশুর বাড়ির দাবিটাও নেহাৎ কম কিছু নয়। ছেলের বয়সের মতো দাবির নিক্তির পাল্লাও বেশ ভারই ছিল। আজ আমার হোম কোয়ারেন্টাইনের দশ বছর পূর্ণ হলো। সেই সাথে তিন কন্যার জননী। বিংশ শতাব্দীতেও পুত্র সন্তান ছাড়া বংশের প্রদীপ জ্বলে না, কারো মুখাগ্নিও নাকি হয় না। সময়ের সাথে সাথে এতো কিছু বদলালো শুধু এই নিয়মটা ছাড়া। তাই অনেকটা বাকবিতন্ডার ইতি টানতে তৃতীয় সন্তানের জন্ম। কথায় বলে, অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়। আমারও তার ব্যাতিক্রম কিছু হল না। ছয় মাস যেতেই খুব ভাল করে উপলব্ধি করলাম ছোট মেয়েটা আমার প্রতিবন্ধী। খুব কেঁদেছিলাম সেই রাতে। দ্বিতীয়বারের মতো আমি খুব কঠিন ভাবে আবারও হোম কোয়ারেন্টাইনে দীর্ঘশ্বাস ফেলছি। আজ আবার নতুন হোম কোয়ারেন্টাইন শব্দটা শুনলাম। তবে অবাক করার ব্যাপার হল, আজকের হোম কোয়ারেন্টাইন আমার আর একার নয়, সারাবিশ্বের। এক কথায় কোটি কোটি মানুষের। আর যার কারণস্বরুপ কোভিড-১৯ ভাইরাস।

কোভিড -১৯ এ পৃথিবী আজ ভীত,সঙ্কিত। ভীত না শুধু রোজ বারান্দার রেলিং এ বসা চড়ুই পাখির জোড়া দুটো। ওরা কেবল আপন মনে আসে আর আপন মনে বাঁচে। ধুকে ধুকে বাঁচার বড্ড যন্ত্রণা। স্বামী আমার সরকারী কর্মকর্তা। চার পাঁচ পদ ছাড়া ঠিক গলাধঃকরণ হয়না। অফিসের রুটিনের মতো খাবারেরও কোন হেরফের হয়না।বড্ড ভাবিয়ে তুলেছে রান্নাঘরের চার দেয়াল বর্তমান পরিস্থিতিটাকে। হঠাৎ ই ছোট বোনের ফোন। রিসিভ করতেই বলে উঠলো গত রাতে ঘুমাতে পারিনি। কারণ জানতে চাইলে বলল, কি ভাবে হবে শুনি! পাশের ব্লকের ভাইয়াভাবি ঝগড়ার এক পযার্য়ে ভাবি সুইসাইড এটেম্পট করেছেন। সেই নিয়েই তো রাত থেকে সোরগোল। ছোট বোনের কথা গুলো খুব ভাবাল। পরক্ষণেই বোনকে জিজ্ঞাসা করলাম তোরা আবার ঝগড়াঝাটি করছিস নাতো?খুব ঝাজালো উত্তর, ঝগড়া হবেনা তো কি হবে? তারসিগারেটের গন্ধে প্রাণ আমার যায় যায় তবুও উনি সিগারেট না ছেড়ে সেটা খাওয়ার জন্য স্পেস খুঁজে চলেছে।ফোনালাপের সমাপ্তি করে একটু দীর্ঘশ্বাস নিতে গেলাম বারান্দায়। দেখছি আজকাল চড়ুই গুলোও আর ঠিকঠা আসেনা। যতদূর চোখ যায় কোথাও কোন জনমানবের টিকিও চোখে পড়ে না। হঠাৎ ই চিতকারে মাথাটা চাড়া দিয়ে উঠলো। নিচ তলার বউদির চিৎকার। কেবলি মনে হচ্ছে এ যেন প্রতিটি পরিবারের নিত্যদিনের চলমান অবস্থা। হরহামেশাই শুনতে পাচ্ছি সবার নাকি স্পেস দরকার, না হয় একটু প্রাইভেসি। হয়তো সিগারেট খাওয়ার জন্য, ফোনালাপের জন্য, নেট ব্রাউজিং এর জন্য কেউ বা আবার চায় বাচ্চাদের চেঁচামেচি থেকে একটু রিলিফ। পূর্বের ন্যায় নিত্যদিনের চলমান অবস্থাকে বহাল রাখাটা কি খুব দরকার? হয়তো কিছুটা দরকার। কিন্তু বর্তমান অবস্থা মাথায় রেখে আমরা কি পারিনা স্পেস না খুজে পরিবার ও প্রিয়জনের মাঝে একটু পিস(শান্তি) খুঁজে নিতে? সংসারের কাজ গুলো একটু ভাগাভাগি করে নিতে? মনে পড়ে? দিনের ক্লান্তি ভুলে নিজের স্ত্রীর জন্য শেষ কবে এক কাপ চা হাতে তুলে দিয়েছিলেন? খুঁনসুটি আর বাক্যালাপের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘদিনের না বলা কথার বিনিময় কবে হয়েছিল? বৃদ্ধ বাবা মা অথবা শ্বশুর শাশুড়ীকে শেষ কবে বলেছিলেন তাদের কিছু চাই কিনা? কর্মজীবী বাবা অথবা মা, কখনো কি সন্তানকে জিজ্ঞাসা করেছেন, বাবা মা ব্যাতিত কারো স্পর্শ তাকে অস্বস্তি দেয় কিনা? শেষ কবে আপনার সন্তানের ঘুমের সময় রুপকথার গল্প শুনিয়েছিলেন? । শেষ কবে ড্রইং এর নামে ঘরময় রং পেন্সিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছিলেন, মনে পড়ে কি? হয়তো পরে বা পরেনা। এই সঙ্কটাপন্ন সময়ে আমরা আমাদের প্রিয়জন, পরিজনের পাশে থাকি, তাদের একটু বুঝতে চেষ্টা করি।

খুব বেশি নয় একটুখানি ধৈর্য্য আর একটু মানিয়ে নেওয়া, যার দরুন ফিরে পেতে পারি পরিবার ও প্রিয়জনের অনেকটা ভালবাসা। এই ভালবাসাই হয়তো আমাদের সামনের কঠিন মুহূর্ত গুলো পাড়ি দেওয়ার এন্টিবডি হবে। কোন ভেন্টিলেটর নয়, এই পারস্পরিক ভালবাসায় হবে আমাদের জীবনীশক্তি কোভিড -১৯ প্রতিরোধে।

প্রীতিলতা মন্ডল
মাস্টার্স শেষ বর্ষ (চারুকলা বিভাগ)
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ-২২২৪.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here