আধ্যাত্মিক প্রেম!

24

প্রেম ভালোবাসা নিয়ে সুফি সম্রাট আল্লামা জালাল উদ্দিন রুমির উক্তি সমূহ। বদলে যাবে প্রেম দর্শন!

পারস্যের কবি জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি ছিলেন ১৩ শতকের স্বনামধন্য মুসলিম কবি, আইনজ্ঞ, ইসলামি ব্যাক্তিত্ব, ধর্মতাত্ত্বিক, অতীন্দ্রবাদী এবং সুফি সাধক।

রুমি নামেই তিনি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এই সুফি সাধক (১২০৭) সালে জন্মগ্রহন করে (১২৭৩) সালের ১৭ ডিসেম্বর পরলোক গমন করেন।

যুগে যুগে রুমি (র) এর জ্ঞান, আধ্যাত্নিকতা, কবিতা এবং উক্তি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। তার লিখা কবিতা বিশ্বব্যাপি ব্যাপকভাবে অনূদিত হয়েছে।

মুসলিম বিশ্ব তথা ইসলামের গন্ডি পেরিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন সকল ধর্মের মানুষের মনে।

রুমি(র) এর বানী অনুপ্রেরনা জুগিয়েছে অসংখ্য মানুষকে এবং আজো জুগিয়ে চলেছেন। রুমি(র)-কে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি’ এবং ‘বেস্ট সেলিং পয়েট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

আল্লামা রুমি তার লেখনী ও কবিতার মাধ্যমে অনেক সুফি ও দার্শনিক উক্তি করে গিয়েছেন যা আজো চির অমর। তার উক্তি গুলো বুঝার জন্য সুফিবাদ এবং তার জীবনী নিয়ে ধারনা থাকাও জরুরী।

এই পোষ্টে ভালবাসা ও প্রেম নিয়ে জালাল উদ্দিন রুমির উক্তি গুলোকে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করে পাঠকদের জন্য নিয়ে আসা হয়েছে।

তিনি প্রেমকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন…ইসকে মাজাযী ও ইসকে হাকিকী…তিনি বলেন…. “আলাল ঈমানা লিমান লা মুহাব্বাতিলাহ “অর্থাৎঃ যার অন্তরে মানুষের প্রতি প্রেম ভালোবাসা নেই তার নিকট ঈমান নেই। 

প্রেম ভালবাসাকে আমরা যেভাবে দেখি তার অনেক উঁচু শিখড় থেকে দেখেছেন সুফি সম্রাট জালাল উদ্দিন রুমি। সৃষ্টিকর্তার প্রতি মানুষের প্রেমের পাশাপাশি তিনি মানুষের সাথে মানুষের প্রেম-ভালবাসাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।

প্রেম নিয়ে জালাল উদ্দিন রুমির উক্তি গুলো অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। প্রেম ভালোবাসা নিয়ে তার বানীতে তিনি বলেছেন –

‘প্রেমই মুক্তি, প্রেমই শক্তি, প্রেমই পরিবর্তনের গুপ্তশক্তি, প্রেমই দিব্য সৌন্দর্যের দর্পন স্বরুপ!’

“প্রেম কোন জ্ঞান বা বিজ্ঞান নয়, বই বা কাগজও নয়। অন্যরা যা বলে তা কখনোই প্রেমের পথ হতে পারে না।” “আমি পূর্বে হয়ত প্রেমের বর্ণনা দিয়েছি, কিন্তু সত্যিকারে যখন প্রেমকে অনুভব করেছি তখন বাকরুদ্ধ হয়েছিলাম।”

“আমার প্রথম প্রেমের গল্প শোনামাত্র তোমাকে খুঁজতে থাকি! কিন্তু জানি না ওটা কতটা অন্ধ ছিল। প্রেম আসলে কোথাও মিলিত হয় না। সারাজীবন এটা সবকিছুতে বিরাজ করে।”

“আমি আমার জন্য মরে গেছি এবং বেঁচে আছি তোমার কারণে।” 

“বিদায় শুধু তারাই বলে যারা শুধু চোখ দিয়ে ভালোবাসে, যারা মনে করে চোখের দেখাই হলো একমাত্র ভালোবাসা। যারা আত্মা আর হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে তাদের কাছে কোন বিদায় নেই, কারণ আত্মা আর হৃদয় থেকে দূরে যাওয়া সম্ভব নয়।”

 “ভালোবাসা হচ্ছে সংযোগ রেখা তোমার আর  সকলের মাঝে।” “তুমি চলে গেলে আমার চোখ দিয়ে রক্ত বাহিত হলো। আমি কেঁদে কেঁদে রক্তের নদী বহালাম।

দুঃখগুলো শাখা প্রশাখা বেড়ে বড় হলো, দুঃখের জন্ম হলো। তুমি চলে গেলে, এখন আমি কিভাবে কাঁদবো। শুধু তুমি চলে গেছো তাই নয়, তোমার সাথে সাথে তো আমার চোখও চলে গেছে। চোখও কাঁদবে প্রিয়!”

“মনের যত গভীরে বাস করবে ততই হৃদয়ের দর্পন পরিষ্কার হতে থাকবে।”

“ধৈর্যের মর্ম কেবল নিবিষ্ট হওয়া বা অপেক্ষমান রওয়া নয়, বরং তা হলো দূরদর্শন করতে পারা। যার অর্থ, কন্টকপানে চেয়েও গোলাপের দর্শন করা;রাত্রি মাঝেও দিবা অবলোকন করা। প্রেমীরাই ধৈর্যশীল আর অবগত যে চন্দ্রেরও কিছু সময় প্রয়োজন হয় পূর্ণ রূপে মোহিত হতে।”

“প্রত্যেকে অদেখাকে তার হৃদয়ের স্বচ্ছতার অনুপাতে দেখতে পায়।”

“যা গত হয়, তা ফিরেও আসে।ফিরে এসো।আমরা পরস্পরকে কখনোই ত্যাগ করিনি।”

“যদি তুমি কারো হৃদয়কে জয় করতে চাও,তাহলে প্রথমে অন্তরে ভালবাসার বীজ রোপণ করো। আর যদি তুমি জান্নাত পেতে চাও তাহলে অন্যের পথে কাঁটা বিছানো ছেড়ে দাও।” 

“বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা হলো তোমার হৃদয়ের গভীরতম স্থান, যেথা হতে জীবনের সূত্রপাত হয়।”

“যখন আমরা প্রত্যাশা, হিসাব আর চুক্তি ব্যতীত কাওকে ভালবাসি; তখনই আমরা প্রকৃত অর্থে জান্নাতে বাস করি।”

“ঈশ্বরের প্রেমে তোমার আত্মাকে উৎসর্গ কর। শপথ করে বলছি তা ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই।”

“যে হৃদয় ভরপূর প্রেমের আগুনে তার প্রত্যেক কথাই হৃদয়ে ঝড় তোলে।”

“তুমি তোমার হৃদয়ের কোমলতাকে খুঁজে বের করো, এরপর তুমি সব হৃদয়ের কোমলতাকেই খুঁজে পাবে!!”

“কোনরূপ না ভেবেই প্রেমে নিজেকে সঁপে দাও”

“দৃষ্টিশীল হও, স্রষ্টার মহানুভবতা হঠাৎ আবির্ভূত হয়। আর তা কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই উন্মুক্ত হৃদয়ের নিকটে আসে।”

“ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হৃদয় ঠিক যেন আগুন পাখির মত, যাকে কোন খাঁচায়ই বন্দি করা সম্ভব নয়।”

“শব্দের অনুসন্ধান বাদ দাও! হৃদয়ের জানালা খুলে দাও এবং তোমার অন্তরাত্মাকে বের হয়ে উড়তে দাও!!!”

“তুমি কেবল দৃষ্টির সীমারেখা থেকে চলে গিয়েছ, হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে নয় হে প্রিয়; সেখানে তুমি সর্বদা বিরাজমান।”

“যদি তুমি চন্দ্রের প্রত্যাশা কর, তবে রাত্রি থেকে লুকিয়োনা। যদি তুমি একটি গোলাপের আশা কর, তবে তার কাঁটা থেকে পলায়ন করোনা। যদি তুমি প্রেমের প্রত্যাশা কর, তবে আপন স্বত্তা থেকে লুকিয়োনা।”

“অন্ধকার হয়ত বৃক্ষ বা ফুলকে দৃষ্টিসীমা থেকে লুকিয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু হৃদয়ে প্রস্ফুটিত সত্য ভালোবাসাকে আড়াল করতে পারে না!”

“যদি থাকে অতুল, তবে দান কর তোমার সম্পদ।যদি থাকে সামান্য, তবে দান কর তোমার হৃদয়।”

“যে মুহূর্তে আমি প্রেমের কাহিনী শুনলামআমি তোমাকে খুঁজতে লাগলাম, না জেনেই যে তা কত অন্ধ ছিলপ্রেমিকেরা অবশেষে মেলে না কোথাওকারন তারা সব সময়ই পরস্পরের মধ্যেই বিদ্যমান থাকে।।”

“পৃথিবী আয়না ব্যতীত আর কিছুই না, যা ভালবাসার নিখুঁত অবয়ব প্রতিফলিত করে।

”যদি সত্যি সত্যিই মানুষ হয়ে থাকো, তবে প্রেমের জন্য সর্বোস্ব বাজি ধরো!!

“শঙ্কার অথৈ সাগরে প্রেমই একমাত্র নির্ভিক সত্তা।”

“প্রেম সর্বদাই তৃষ্ণাস্বরুপ! ইহা সর্বদাই তৃষ্ণার্ত প্রেমিককে অন্বেষণ করে! প্রেম এবং প্রেমিক এই দুই জিনিস পরস্পরকে রাত এবং দিনের মতই অনুসরন করে!”

“যে তোমাকে সত্যিই মন দিয়ে ভালোবাসবে সে তোমাকে সব রকম বন্ধন থেকে মুক্ত রাখবে।”

“যেখানে মন কেবল সীমানাই দেখতে পায়, প্রেম সেখানেও গোপন পথ খুঁজে বের করে।”

“প্রেম কোন ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে না……প্রেম অসীম সাগরের মত, যার কোন প্রারম্ভ বা সমাপ্তি নেই।” 

“পরমপ্রিয় আমার পানে চাহিলেন,কহিলেন, মমতাভরা দৃষ্টি লইয়া;কেমন করিয়া তুমি আমি বিনে বসত কর? উত্তরে কহিলাম: ঠিক যেমন মীন অবস্থান করে জল ব্যতীত।”

“আমি কোন নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী নই। প্রেমই আমার ধর্ম! প্রত্যেক হৃদয়ই আমার উপাসনালয়!”

★ সুফী, দার্শনিক ইমাম গাজ্জালীর উক্তি ও  জ্ঞান-অন্বেষী জীবনমুখী উপদেশ বাণীসমূহ,

“প্রকৃতির সৌন্দর্য বসন্তে বিকশিত হয়,আবার শীতে ঝরে যায়, কিন্তু প্রভুর স্বর্গীয় ভালোবাসা কোন নিদিষ্ট ঋতুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়!”

“যদি তুমি জীবনের গোপন রহস্য জানতে,তাহলে তুমিও ভালোবাসা ছাড়া অন্য কিছুকে সংগী বানাতে না।”

“ভালবাসার বাড়িতে সংগীত কখনো থামে না। এর দেয়াল গুলা থাকে সংগীতের আর মেঝে গুলা থাকে সদা নৃত্যরত।”

“যখন আমরা আলোচনা-সমালোচনা, হিসেব-নিকেশ, আশা-প্রত্যাশা ছাড়াই কাউকে ভালোবাসতে পারবো, ঠিক তখনি আমরা বাস্তবে জান্নাতে থাকতে পারবো।”

“বেশিরভাগ কষ্ট ও মানসিক দুশ্চিন্তা মুখের কথার কারনে হয়ে থাকে।কখনো কারো কথায় বেশি গুরুত্ত্ব দিও না। ভালবাসার রাজ্যে কথার কোন স্থান নেই। ভালোবাসা হল নিরবতা।”

“যখন তুমি সত্য ভালোবাসায় পড়বে, তখন শরীর, মন, আত্মার কোন অস্তিত্বই খুঁজে পাবে না। এমন ভালোবাসায় পতিত হও, তাহলে তোমাকে কখনও আবার আলাদা হতে হবে না।”

“ভালবাসা সবকিছুকে জুড়ে রাখে;আর এই ‘সবকিছু’ হল-ভালবাসাই।”

“প্রেম হলো খোদার অনন্ত মহাসাগর।”

“যেদিন তোমার প্রেম আমায় স্পর্শ করবে, সেদিন আমি এতই উন্মত্ত হবো যে এমনকি সকল উন্মাদও আমা হতে পালাবে।”

“এমনকি বসন্তে অস্তিত্ব লাভ করা বস্তুও শরতের শেষে এসে ক্ষয়ে যায়;কিন্তু, প্রেম! সে তো কোন নির্দিষ্ট মৌসুমের নয়।”
“ভালবাসা অসীম পরমআত্মা থেকে এসেছে এবং চিরকাল এটা অমর হয়েই থাকবে ।”

“ভালবাসা ছাড়া পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসও যন্ত্রণাদায়ক মনে হয়।”

“এই যন্ত্রণা শেষে মানুষকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায় এবং পরিশেষে তাকে জীবন নদীর পানিও পান করতে দেয় না।”

“যখন আমি আমাকে ভালবাসি তখন মনে হয় তোমাকেই ভালবাসি , আর যখন তোমাকে ভালবাসি তখন মনে হয় আমি আমাকেই ভালবাসি ।”

“ভালবাসার সমুদ্রে আমি লবনের মত গলে গিয়েছি , সেখানে বিশ্বাস অবিশ্বাস সব দ্রবীভূত হয়ে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।এখন একটি উজ্জ্বল জ্যোতি আমার অন্তরে জেগেছে, যার আলোয় সারা দুনিয়া আলোকিত হয়ে গেছে।”

“আমার জীবন সায়াহ্নে, কেবল এক ফোটা নিঃশ্বাস অবশিষ্ট রইবে যখন;যদি তখন তুমি আসো, তবে আমি বসবো আর গীত গাইবো।”

“হে প্রেম, হে মানস-পট, স্বর্গ-পথের সন্ধানে যাও; স্রষ্টার ক্ষেত্র সন্ধানে রত হও।”

“আমি এক মহাসমুদ্র; জলসিন্ধু!!! আর তুমি সেখানে মীনরুপ! আমাকে রেখে শুষ্কভূমিতে যেয়ো না!! কারন আমিই তোমার জন্য স্বাচ্ছন্দ্যদায়ী জলধি!!”

“ভুলে যাও বিশ্বের সব জাতি, ধর্ম, বর্ণের সকল ভেদা ভেদ। কেবল নিজের লক্ষ্য ও গন্তব্য ঠিক করে নাও। মনে রেখ তুমি হলে একটি আত্মা আর তোমার কর্ম হল শুধুই ভালবেসে যাওয়া।”

“বন্য এবং পাগলের মত হয়ে যাও, ভালবাসার শূরা পান কর, যদি তুমি খুব বেছে সাবধানে চলাফেরা কর, তাহলে ভালবাসা তোমাকে কখনও খুঁজে পাবে না।”

“কোন প্রকার চিন্তা ভাবনা ছাড়াই স্বর্গীয় ভালবাসায় নিজেকে সমর্পিত করে দাও।”

“সত্যিকারের ভালবাসার মানুষ যারা তারা হয় সবচেয়ে আলাদা, যে হবে তোমার শুরু এবং তোমার শেষ। যখন তুমি সেই রকম কাউকে পেয়ে যাবা, তখন তুমি দুনিয়ার আর কিছুই প্রত্যাশা করবা না।”

“স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর অজস্র পথ আছে। তার মাঝে আমি প্রেমকে বেছে নিলাম।”

“দুই ব্যক্তি জীবনে কখনো সন্তুষ্ট হয়না; বিশ্বপ্রেমী আর জ্ঞানপ্রেমী।”

সুফি সম্রাট আল্লামা জালালুদ্দিন রুমি (র) প্রেমের ভেলায় চড়ে সারা জীবন প্রেমের গানই গেয়ে বেড়িয়ছেন তার আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে, তার লেখনীর মাধ্যমে।

বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদিত তার লিখা ‘মসনবী’ শরিফে সুদীর্ঘ কবিতাগুচ্ছের মাধ্যমে সারাবিশ্ব জুড়ে আজো লক্ষ কোটি মানুষকে বেঁচে থাকার আশা, অনুপ্রেরণা এবং সৃষ্টি সম্পর্কে অবহিত করে চলেছেন।

ভালবাসা ও প্রেম নিয়ে আল্লামা জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমির উক্তি সমূহ যুগে যুগে আমাদের প্রেমকে শাণিত করেছেন। প্রেমের মাহাত্ম্য অনুভবে সহায়তা করে চলেছেন।

পাশাপাশি জীবন নিয়ে ব্যাপক অনুধাবনের পর জীবন দর্শন নিয়ে রুমির বানী গুলো মানুষকে জীবন সংগ্রামে সহায়তা করে চলেছে। 

লেখক: মোহাম্মদ ইকবাল হাসান ইকু, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here